Last Updated:
Iswar Chandra Vidyasagar: দুই শতক আগে গ্রাম বাংলার এই নারী ছিলেন নিজের সময়ের থেকে কয়েক যোজন এগিয়ে৷ তাঁর প্রভাবে উদ্ভাসিত হয়ে ছিলেন আত্মজও৷ সময়ের সোপান পেরিয়ে ভগবতী-পুত্রের জ্য়োতিতে আলোকিত সমাজ৷ বিদ্য়াসাগরের উপর তাঁর জন্মদাত্রীর প্রভাব থেকে গিয়েছে অনালোচিত৷
ছেলের বড় সাধ, মাকে তিনটে সোনার গয়না গড়িয়ে দেবেন৷ সেই মতো মায়ের কাছে জানতে চাইলেন স্যাঁকরাকে কোন কোন গয়নার বরাত দেবেন৷ উপযুক্ত ছেলের কাছে মা’ও চেয়ে নিলেন পছন্দসই গয়না৷ কী কী? তিনি চাইলেন গ্রামে একটি বালিকা বিদ্যালয়৷ মেয়েদের পঠনপাঠন যাতে শুরু করা যায়৷ অসুস্থদের জন্য চিকিৎসাকেন্দ্র, যাতে চিকিৎসার জন্য বেশি দূর যেতে না হয় এবং একটি ছাত্রাবাস, যাতে দূরদূরান্ত থেকে পড়তে আসা পড়ুয়াদের অসুবিধে না হয়৷ তিন অলঙ্কারই ছেলে গড়িয়ে দিয়েছিলেন মাকে৷ আজ থেকে দুই শতক আগে, এই ঘটনার পটভূমি ছিল আজকের বীরসিংহ গ্রাম৷ উজান স্রোতে পাড়ি দেওয়া সেই রত্নগর্ভা হলেন ভগবতী দেবী এবং ‘গয়না’ গড়িয়ে দেওয়া পুত্র ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর৷ মায়ের জন্য তৈরি করা বিদ্যাসাগরের সেই ‘অলঙ্কারের’ মধ্যে ভগবতী দেবীর নামাঙ্কিত মেয়েদের জন্য স্কুল এবং বিদ্যাসাগর গ্রামীণ হাসপাতাল আজও আছে৷
আদতে ঈশ্বরচন্দ্রের মাতৃভক্তি নিয়ে যত আলোচনা হয়, তার চিলতে কথাও শোনা যায় না তাঁর উপর ভগবতী দেবীর উদার ভাবনাচিন্তার প্রভাব নিয়ে৷ উনিশ শতকের গ্রামবাংলার এই নারী শুধু রত্নগর্ভাই ছিলেন না, তিনি নিজেও ভাবনাচিন্তায় ছিলেন রত্নসমা৷ বাংলা তথা ভারতের অচলায়তন সমাজ যাঁর হাত ধরে এগিয়ে গিয়েছিল কয়েকশো যোজন, সেই বিদ্যাসাগরের মননে নারীকল্যাণের বর্ণপরিচয় হয়েছিল মায়ের কাছেই৷ সম্প্রতি সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওয় নতুন করে আলোচিত সে প্রসঙ্গ৷ সংস্কৃতি বিচিত্রা ইউটিউব চ্যানেলে ওই পডকাস্ট ভিডিওয় এই প্রসঙ্গে বলেছেন অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়৷ তিনি শুধু বিদ্যাসাগর-অনুরাগীই নন, সম্পর্কের লতায় পাতায় উত্তরসূরিও বটে! ঈশ্বরচন্দ্রের মেজো মেয়ে কুমুদিনী দেবীর বংশধারার পরবর্তী প্রজন্মের সোপানে তিনি আছেন৷ অমিতাভের আক্ষেপ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান আমরা বিস্মৃত৷ গত বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি সক্রিয় ভাবে কাজ করছেন বিদ্যাসাগরের অবদানকে বিস্মরণের পর্দা সরিয়ে বার করে আনার লক্ষ্যে৷ কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সাম্মানিক পেতেন৷

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মেরুদণ্ড দৃঢ় রেখে যাওয়া এই মনীষী তাঁর উপার্জনের সিংহভাগ দান করে দিয়েছেন সম্পূর্ণ অপরিচিত জনের কল্যাণে৷ সেই যাপনের নান্দীমুখ হয়েছিল মা ভগবতী দেবীর কাছেই৷ আজ, হেমন্তের পড়ন্ত বেলায় যখন ধনতেরস আসে, কোনও মা কি ভাবতে পারবেন তাঁর সুযোগ্য সন্তানের কাছ থেকে এমন গয়না চাইতে? যে মায়ের কাছে স্বর্ণালঙ্কারের সংজ্ঞা লুকিয়ে আছে পরহিতে, তাঁর আত্মজ সম্বন্ধেই মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলতে পারেন, ‘‘বিদ্যাসাগরের মধ্যে আছে প্রাচীন ভারতের ঋষির প্রজ্ঞা, একজন ইংরেজের কর্মশক্তি এবং বাঙালি মায়ের কোমল হৃদয়৷’’ কার্যত ঈশ্বরচন্দ্র দেব শর্মণঃ সেই প্রিজম, যাঁর মাধ্যমে মুক্তির সাতরঙা আলো ছড়িয়ে পড়ে আলোকবর্ষ পেরিয়ে৷ সেই আলো-পথ ধরে হেঁটে যদি পাড়ি পৌঁছয় অতীতে, সময়স্কোপে ফুটে ওঠা ছবি বলে,‘ঈশ্বর’-এর সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা ভাবনাচিন্তার অন্যতম আকর ছিলেন তাঁর মা, ভগবতী দেবী৷ উনিশ শতকের এই বঙ্গনারী ছিলেন ঈশ্বর-উত্তরণের অন্যতম অনুঘটক।
(তথ্যঋণ: করুণাসাগর বিদ্যাসাগর, ইন্দ্রমিত্র
সেই সময়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)

