Last Updated:
Teacher’s Day 2026: অবসরের পর বিগত ৩ বছর ধরে বিনামূল্যে ক্লাস নিচ্ছেন কালনার শিক্ষক গঙ্গাধর পাল। বেতনের এক টাকা নিজের কাছে রেখে বাকি সঞ্চয় বিলিয়ে দিয়েছেন স্কুলের উন্নয়নে। কর্মজীবনে ছুটি নিয়েছেন মাত্র তিনদিন। মায়ে কথা জীবন বদলে দিয়েছে এই শিক্ষকের।
কালনা, পূর্ব বর্ধমান, বনোয়ারীলাল চৌধুরী: শিক্ষকতা তাঁর কাছে শুধু পেশা নয়, জীবনের ব্রত। তাই অবসর নিয়েও থামেনি পড়ানো। পূর্ব বর্ধমানের কালনা মহকুমার কুতুবপুর মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক গঙ্গাধর পাল ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে অবসর নিয়েছেন। কিন্তু অবসরের পরেও আজ পর্যন্ত প্রতিদিন নিয়ম করে বিদ্যালয়ে আসেন, পড়ুয়াদের ক্লাস নেন। প্রায় তিন বছর ধরে একইভাবে চলছে তাঁর শিক্ষকতা। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ চাকরি জীবনে তাঁর কর্মনিষ্ঠার নজিরও অনন্য। চাকরি জীবনে ছুটি নিয়েছেন মাত্র তিন দিন। গঙ্গাধরবাবুর কথায়, তিনি বিদ্যালয়কে ভালবাসেন, শিক্ষা ও ছাত্রছাত্রীদের ভালবাসেন।
পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর আনন্দ। তবে গঙ্গাধর পালের এই পথচলা শুধু অবসরের পরেও ক্লাস নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ চাকরি জীবনে তিনি যে বেতন পেয়েছেন, তার মধ্যে নিজের জন্য রেখেছেন মাত্র এক টাকা। সেই এক টাকা তিনি গুরুদক্ষিণা হিসেবে নিজের কাছে রেখেছেন। আর বাকি অর্থ সঞ্চয় করে বিদ্যালয়ের উন্নয়নে ব্যয় করেছেন। স্কুলে শৌচালয়, ঘর, চেয়ার-বেঞ্চ, লাইব্রেরি, পানীয় জল কিংবা আলোর প্রয়োজন, সাধ্যমতো একে একে সেই সমস্ত ব্যবস্থা করেছেন তিনি। তাঁর এই মানসিকতার পিছনে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর মা। গঙ্গাধরবাবু জানান, তাঁর মা তাঁকে বলেছিলেন, সংসারে তাঁদের আর্থিক সমস্যা নেই। কিন্তু তিনি যে স্কুলে কাজ করছেন, সেখানে বহু পড়ুয়ার বই-খাতা কেনারও সামর্থ্য নেই।
তাই সুযোগ পেলে যেন সেই পড়ুয়াদের জন্য কিছু করেন। মায়ের সেই কথাই যেন জীবনের পথ দেখায় গঙ্গাধরবাবুকে।বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক সৌমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “সত্যিই এই উদ্যোগ মহৎ উদ্যোগ।” অবসরের পরেও স্কুলের শিক্ষক-সংকট তাঁকে ভাবিয়েছে। নিজের সঞ্চয় থেকে ছয় লক্ষ টাকা রেখে দিয়েছেন তিনি। সেই টাকার সুদ থেকে বর্তমানে বিদ্যালয়ে দু’জন শিক্ষককে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। সরকারি নিয়োগ নয়, তবুও পড়ুয়াদের স্বার্থে সাধ্যমতো তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। তাঁর এই উদ্যোগে উপকৃত হচ্ছেন স্কুলের পড়ুয়ারাও। একজন শিক্ষক অবসর নেওয়ার পরেও কীভাবে নিজের বিদ্যালয় এবং ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে পারেন, গঙ্গাধর পাল যেন তারই জীবন্ত উদাহরণ।
এক অভিভাবক মন্টু শেখ বলেন, “সত্যিই স্যার খুব ভাল মানুষ। স্যার চলে গেলে আমাদেরও খারাপ লাগবে।” গঙ্গাধরবাবুর বিশ্বাস, কর্মের মধ্যেই জীবনের আনন্দ। শিক্ষক দিবসে বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষকদের উদ্দেশেও তাঁর বার্তা শিক্ষকতা শুধুমাত্র বেতন পাওয়ার পেশা নয়, এটি একটি ব্রত। ভালবেসে পড়ুয়াদের তৈরি করতে হবে। কারণ একজন ছাত্র ভবিষ্যতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা বিজ্ঞানী হয়ে উঠলে শুধু তাঁর পরিবার নয়, উপকৃত হবে গোটা দেশ। সেই ভাবনা থেকেই নিজের জীবনের উপার্জন, সময় এবং শ্রম উৎসর্গ করে চলেছেন তিনি। অবসর তাঁর চাকরি জীবনের ইতি টেনেছে ঠিকই, কিন্তু থামাতে পারেনি তাঁর শিক্ষকতাকে। তাই শিক্ষক দিবসে কুতুবপুর মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্রের গঙ্গাধর পাল শুধু একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নন, তিনি আজও তাঁর পড়ুয়াদের কাছে প্রতিদিনের শিক্ষক।
