Last Updated:
Kali Puja 2026: বীরভূমের জাজিগ্রামের ঐতিহ্যবাহী কালীপুজোর ইতিহাস ও অলৌকিক মহিমা। ক্যানসার ও চোখের রোগ নিরাময়ে ভক্তদের বিশ্বাস। প্রায় ১০০ প্রতিমার পুজো হয় এই জায়গায়। পুজোর জাঁকজমক থেকে বিসর্জনের শোভাযাত্রা, সবমিলিয়ে বিশাল উৎসব।
বীরভূম, সৌভিক রায়: মুরারই থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জাজিগ্রাম। এখানকার কালীপুজো মানেই নিছক কোনও ধর্মীয় উৎসব নয়, এক বিশাল মিলনমেলা ও অলৌকিক বিশ্বাসের স্রোত। দুর্গাপুজোর জৌলুসকে পেছনে ফেলে এই গ্রামে কালীপুজোই প্রধান শারদোৎসবের রূপ নেয়। মুর্শিদাবাদ জেলার হিলোড়া এবং বীরভূমের পাইকর থানার সীমান্তবর্তী জাজিগ্রাম ও হিলোড়া এই দুই গ্রাম মিলে কালীপুজোকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর এক অভূতপূর্ব উৎসবের চেহারা নেয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকা থেকেও হাজার হাজার মানুষ এই মহোৎসবে সামিল হন।
জাজিগ্রামের কালীপুজো ঘিরে রয়েছে বহু প্রাচীন ও রোমাঞ্চকর ঐতিহ্য। জানা যায়, এই অঞ্চলে প্রায় ৪০টি কালী ও অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তি নিয়ে মোট একশর কাছাকাছি প্রতিমা পুজিত হয়। অন্যদিকে, পাশের হিলোড়া গ্রামেও প্রায় ৩০টি প্রতিমা তৈরি হয়। এই পুজোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলও এর সূচনা পর্ব। জাজিগ্রামের প্রধান ‘বৃদ্ধামাতা’র প্রতিমা তৈরি হয় তরাতলায়। পুজোর দিন সন্ধ্যায় মশাল জ্বালিয়ে এলাকার মানুষ ঢাকের তালে সেই প্রতিমা কাঁধে করে বেদিতে নিয়ে আসেন। যুগ যুগ ধরে এই রীতি চলে আসছে। পুজোর রাতে যখন প্রথমবার বিশাল শব্দে পটকা ফাটানো হয়, সেই শব্দকে সংকেত হিসেবে ধরে নিয়ে গ্রামের একে একে সব বেদিতে অন্যান্য প্রতিমা তোলা হয়।
এরপর দ্বিতীয়বার পটকা ফাটানোর সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় মূল পুজো ও বলিদান। পুজোর ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের দিনও রয়েছে এক অনন্য ঐতিহ্য হিলোড়া গ্রামের প্রতিমা বৃদ্ধামাতাতলা প্রদক্ষিণ করে এবং জাজিগ্রামের প্রতিমা হিলোড়া গ্রামে যায়। দুই গ্রামের পারস্পরিক পরিক্রমা সম্পন্ন হওয়ার পরেই কেবল প্রতিমা নিরঞ্জন হয়। জাজিগ্রামের প্রতিটি কালী প্রতিমার পৃথক নাম, রূপ এবং সুনির্দিষ্ট মাহাত্ম্য রয়েছে। এখানকার প্রতিমাগুলির মধ্যে রয়েছে দিগম্বরী, আনন্দময়ী, কৃপাময়ী, ইচ্ছাময়ী, মুক্তকেশী, করুণাময়ী, জয় কালী, দয়াময়ী ইত্যাদি। স্থানীয় বাসিন্দা বিশাল ঘোষ জানান, “আনন্দময়ী এলাকার সব থেকে বড় প্রতিমা, আর তাঁর বোন হলেন কৃপাময়ী।”
তবে এই পুজোর সবচেয়ে বড় অলৌকিক দিকটি জড়িয়ে রয়েছে ‘মুক্তকেশী’ মায়ের সঙ্গে। এলাকাবাসীর দৃঢ় বিশ্বাস, মারণ রোগ ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীরা কিংবা তাঁদের পরিবারের লোকজন সুস্থতার আশায় এই মায়ের কাছে মানত করলে মা তাঁদের ফেরান না। চোখের যেকোনও সমস্যার ক্ষেত্রেও আনন্দময়ী মায়ের কাছে মনস্কামনা জানালে অলৌকিক ফল পাওয়া যায় বলে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে। মুক্তকেশী বাড়ির পুজোর পরিবারের ছোট মেয়ে পারমিতা রায় এই বিশ্বাসের বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বলেন, “আমার কাকুর ১২ বছর আগে ক্যানসার ধরা পড়েছিল। আমরা মায়ের কাছে মানত করেছিলাম, মায়ের কৃপায় আমার কাকু আজ সম্পূর্ণ সুস্থ জীবন কাটাচ্ছেন।”
এমন অসংখ্য মানুষের বিশ্বাস ও অলৌকিক নিরাময়ের গল্পই এই পুজোকে অনন্য উচ্চতা দিয়েছে। কালীপুজোকে কেন্দ্র করে জাজিগ্রামে বসে এক বিশাল প্রাচীন মেলা, যা চলে টানা পাঁচ দিন ধরে। আধুনিক শপিংমল বা অনলাইন মার্কেটের যুগেও এই মেলার আবেদন একটুও কমেনি। প্রবীণদের মতে, আগেকার দিনে গ্রামগঞ্জের মানুষ সারা বছর ধরে এই মেলা থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র থেকে শুরু করে সব ধরনের কেনাকাটা করার জন্য অপেক্ষা করে থাকতেন। আজও সেই ঐতিহ্যবাহী মেলা ঘিরে এলাকার মানুষের উৎসাহ ও উদ্দীপনা তুঙ্গে থাকে। ধর্ম, বিশ্বাস, অলৌকিক নিরাময় ক্ষমতা এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছে জাজিগ্রামের এই কালীপুজো।

