পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ যুব কংগ্রেসের দফতরের লেটারহেডে জারি করা নির্দেশে জানানো হয়েছে, দিল্লির প্রতিবাদ কর্মসূচিতে পদাধিকারীদের অনুপস্থিতির বিষয়টি সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেস নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছে। সেই কারণেই এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সাময়িকভাবে বরখাস্ত হওয়া ২৬ জনের তালিকায় রয়েছেন কোচবিহার জেলা যুব কংগ্রেস সভাপতি সুকমল বর্মন, জলপাইগুড়ির নবীনেন্দু মৌলিক, উত্তর দিনাজপুরের মামুন রেজা, পূর্ব বর্ধমানের মিঠুন সরকার, উত্তর কলকাতার অভিষেক গুপ্ত এবং দক্ষিণ কলকাতার ইন্দ্রজিৎ মণ্ডল।
প্রদেশ যুব কংগ্রেস সভাপতি সৌরভ প্রসাদ জানিয়েছেন, শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশ মেনেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তে খুশি নন যুব কংগ্রেস নেতা রোহন মিত্র। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের জন্য কাজ করছেন, তাঁদের অনুপস্থিতির কারণ মানবিক ও বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
রোহন মিত্রের বক্তব্য, ‘‘আমাদের যুব কংগ্রেসের যে ছেলেমেয়েরা দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন করে আসছেন, তাঁদের অধিকাংশই অত্যন্ত সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা। জীবনের আট-দশটা বছর তাঁরা সংগঠনের জন্য দিয়ে দেন, অথচ সেই সময়ে ক্ষমতার কোনও সুযোগ-সুবিধা বা কাছাকাছি থাকার সুযোগ তাঁদের থাকে না। নিয়ম অনুযায়ী ৩৫ বছর বয়সের পর যুব কংগ্রেসে সক্রিয় থাকারও একটা সীমা রয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে অনেক সময় সেই নিয়মও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না।
তবুও আজ যাঁদের সাসপেন্ড করা হয়েছে, তাঁদের বিষয়ে আমি কয়েকটি কথা বলতে চাই। বিশেষ করে, যাঁরা দিল্লিতে যেতে পারেননি, তাঁদের অনুপস্থিতির কারণটা একটু মানবিক ও বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করা দরকার।
প্রথমত, আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, সেই সময় কলকাতা থেকে দিল্লি যাওয়ার ট্রেনের টিকিট পাওয়া অত্যন্ত কঠিন ছিল। পুজো ও দীপাবলির মতো উৎসবের মরশুমে ট্রেনের টিকিট পাওয়া এমনিতেই যথেষ্ট সমস্যার। দ্বিতীয়ত, বিমানে যাতায়াত করতে হলে একজনের প্রায় ২০-২৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়।
এবার একটু বাস্তব পরিস্থিতিটা ভাবুন। আমাদের যুব কংগ্রেসের যে সাধারণ ছেলেমেয়েরা বছরের পর বছর সংগঠন করে আসছেন, তাঁদের অনেকের পক্ষেই দু-তিন দিনের মধ্যে ২০-২৫ হাজার টাকা খরচ করে দিল্লি যাওয়া কার্যত অসম্ভব। কারও কাছে টাকা চাইতে হবে, কাউকে বলতে হবে টিকিটটা করে দেওয়ার জন্য। অর্থাৎ, নিজের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও অন্য কারও আর্থিক সাহায্যের উপর নির্ভর করতে হবে। আর কারও কাছ থেকে কোনও ফেভার নিলে, অনেক সময় ভবিষ্যতে সেই ফেভারের প্রতিদান দেওয়ার একটা অলিখিত চাপও তৈরি হয়। একজন সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীর কাছে সেটাও একটা অস্বস্তির জায়গা।
আমি দেখেছি, অনেক জেলা সভাপতি তাঁদের কমিটির সদস্যদের দিল্লিতে পাঠিয়েছেন। তাঁদের পক্ষে হয়তো ট্রেন বা বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা করা তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল। তাঁরা গিয়েছেন, ভালো কথা। কিন্তু সবার আর্থিক সামর্থ্য তো এক নয়। যাঁরা যেতে পারেননি, তাঁদের প্রত্যেককে একই মাপকাঠিতে বিচার করে সাসপেন্ড করে দেওয়াটা আমার মনে হয় আরও একবার ভেবে দেখা উচিত।
আমি সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের নেতৃত্বকে অনুরোধ করব, বিষয়টিকে একটু মানবিকভাবে এবং বাস্তব পরিস্থিতির নিরিখে বিবেচনা করুন। অর্থ একটা বড় ফ্যাক্টর। অনেকের ক্ষেত্রে ২০-২৫ হাজার টাকা তাঁদের এক মাসের উপার্জনের সমান, কখনও কখনও তার থেকেও বেশি।
যে ছেলেমেয়েরা এতদিন ধরে কংগ্রেসের খারাপ সময়েও দলের পতাকা ধরে রেখেছেন, তাঁদের এভাবে সাসপেন্ড করে মনোবল ভেঙে দেবেন না।
আজ যুব কংগ্রেসে নতুন অনেকেই আসছেন। তাঁদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছেন, যাঁরা একসময় তৃণমূল কংগ্রেসে গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন বা বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন। তাঁদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান হয়তো আমাদের সেই পুরনো যুব কংগ্রেস কর্মীদের তুলনায় অনেকটাই স্বচ্ছল। আমি তাঁদের যোগদানকে কোনওভাবেই ছোট করছি না। কিন্তু যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে থেকে, কোনও ক্ষমতা বা আর্থিক সুবিধা ছাড়াই সংগঠন করে এসেছেন, তাঁদের সঙ্গে নতুন করে আসা সকলকে একই মাপকাঠিতে বিচার করা উচিত নয়।
এই পুরনো ছেলেমেয়েরাই অত্যন্ত খারাপ সময়ে রাহুল গান্ধীর আদর্শ ও নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে কাজ করেছেন। এমন অনেক জায়গায় তাঁরা কংগ্রেসের হয়ে লড়াই করেছেন, যেখানে তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতৃত্বের উপস্থিতি ছিল। তাঁদের অনেকেই মানসিক ও শারীরিক অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। তা সত্ত্বেও তাঁরা কংগ্রেসের পতাকা ছেড়ে যাননি।’’
অর্থাৎ, দিল্লির সমাবেশে যোগ দিতে না পারার পিছনে অনেকের আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব পরিস্থিতি কাজ করেছে বলেই দাবি রোহন মিত্রের। তাঁর আবেদন, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও যাঁরা কংগ্রেসের সংগঠন ধরে রেখেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করার আগে বিষয়টি আরও একবার মানবিকতার সঙ্গে বিবেচনা করুক সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেস নেতৃত্ব।
