Last Updated:
West Medinipur News: পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলার ধনেশ্বরপুর এলাকায় চা বিক্রেতা শঙ্কর কৈলার দোকানে চায়ের সঙ্গে বিনামূল্যে গ্রাহকদের কবিতা আবৃত্তি শোনানো হয়। তাঁর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের জেরে দোকানে প্রতিদিন উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে।
পিংলা, পশ্চিম মেদিনীপুর, রঞ্জন চন্দ: সকাল থেকে সন্ধ্যা মাটির ভাঁড়ে বা কাচের গ্লাসে ধোঁয়া ওঠা গরম চা। সঙ্গে একটু খোশগল্প আর রাজনীতি থেকে খেলার কচকচানি— বাঙালির চায়ের দোকানের চেনা ছবি এটিই। কিন্তু গরম চায়ে চুমুক দেওয়ার ফাঁকে যদি উপরি পাওনা হিসেবে কানে ভেসে আসে দরাজ গলায় মনকাড়া কবিতা আবৃত্তি, তবে আড্ডার মেজাজটাই নিমেষে বদলে যেতে বাধ্য। চায়ের দোকানে এলে বিস্কুট নয়, ‘টা’ হিসেবে বিনামূল্যে মিলছে সুরের মূর্ছনা ও ছন্দ। এমন এক ব্যতিক্রমী আবহের সাক্ষী থাকতে হলে পৌঁছে যেতে হবে পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলার ধনেশ্বরপুর এলাকায়। পেশায় চা বিক্রেতা হলেও ৪৩ বছরের শঙ্কর কৈলার ধ্যান-জ্ঞান আর অন্তরের টান কিন্তু জুড়ে রয়েছে আবৃত্তির সঙ্গেই।
বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই কবিতার ছন্দের প্রতি এক গভীর টান অনুভব করতেন তিনি। তবে জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে কোনও প্রথাগত তালিম বা শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ জোটেনি তাঁর। কিন্তু অভাব-অনটন কখনও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি তাঁর প্রতিভার সামনে। স্রেফ অদম্য জেদ আর একাগ্রতার জোরেই আজ তিনি এক সফল বাচিক শিল্পী হিসেবে নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছেন। শুধু চায়ের দোকানেই নয়, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মঞ্চ কিংবা স্কুল-কলেজের অনুষ্ঠানেও ডাক পড়ে তাঁর। কখনও নিজের লেখা স্বরচিত কবিতা, আবার কখনও বিশিষ্ট কবিদের চেনা পঙ্ক্তি— তাঁর ভরাট গলার পরিবেশন শ্রোতাদের ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ করে দেয়। এক সময় বাংলা ধারাবাহিকেও দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন তিনি।
শঙ্করবাবুর কাছে আবৃত্তি নিছক শখ নয়, বরং আত্মার আত্মীয়। দোকানের খদ্দেরদের নিজের লেখা কবিতা শুনিয়ে যেন এক পরম শান্তি ও তৃপ্তি খুঁজে পান তিনি। জীবনের বাকি দিনগুলোও এভাবেই কবিতার সুরে ও ছন্দে কাটিয়ে দিতে চান এই শিল্পী। শরীরে যতদিন গলার জোর রয়েছে, ততদিন একজন সাধারণ চা বিক্রেতা হয়েও নিজের মনের ভেতরের এই শিল্পসত্তাকে আগলে রাখতে চান পিংলার এই ‘আবৃত্তি পাগল’ মানুষটি।
প্রতিদিন নিয়ম করে তাঁর দোকানে ভিড় জমান স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে পথচলতি নানা বয়সের মানুষ। অনেকেই স্রেফ তাঁর ভরাট গলার পাঠ শুনতেই চায়ের দোকানে আসেন। সাধারণ জীবনের দৈনন্দিন ব্যস্ততার মাঝে এভাবেই বেঁচে রয়েছে এক অনন্য শিল্পসত্তা। চায়ের উষ্ণ পেয়ালা আর কবিতার মেলবন্ধনে পিংলার এই ছোট্ট দোকানটি আজ আক্ষরিক অর্থেই এক অন্য ধারার সংস্কৃতির ঠিকানা হয়ে উঠেছে।
