Last Updated:
Handloom Industry: পুজোর কেনাকাটায় সরগরম বিখ্যাত সমুদ্রগড় হাট! কিন্তু মাশরু বেনারসি, মোডাল আর বাংলাদেশি মসলিন জামদানির দাপটে ব্যাকফুটে নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত তাঁত শাড়ি। কাজ হারিয়ে পরিযায়ী হচ্ছেন স্থানীয় তাঁতিরা।
কালনা, পূর্ব বর্ধমান, বনোয়ারীলাল চৌধুরী: পুজোর বাজারে শাড়ি কিনতে ভিড় জমেছে সমুদ্রগড়ের ঐতিহ্যবাহী গণেশচন্দ্র কর্মকার তাঁত কাপড় হাটে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের আনাগোনায় সরগরম থাকছে হাট চত্বর। কিন্তু শাড়ির পসরা যতই বাড়ছে, ততই যেন চোখে পড়ছে এক অন্য ছবি। তাঁত কাপড়ের জন্য পরিচিত এই হাটেই স্থানীয় হস্তচালিত তাঁতের শাড়ির পাশাপাশি দাপট বাড়ছে ভিনরাজ্য ও ভিনদেশের শাড়ির। ব্যাঙ্গালোর, অসম, সুরাট এবং বাংলাদেশি শাড়ির চাহিদা এবারের পুজোর বাজারে বেশ ভাল বলে জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। মাশরু বেনারসি, মোডাল, ব্যাঙ্গালোর সিল্ক, মসলিন জামদানি-সহ আধুনিক নকশার হালকা শাড়ির দিকেই ঝুঁকছেন ক্রেতাদের বড় অংশ। তাঁত ব্যবসায়ী চিরন দেবনাথ বলেন, “আমাদের তাঁতের অবস্থা বেহাল। সরকার যদি আমাদের তাঁতিদের কথা ভাবে তাহলে খুব ভাল হয়।”
স্থানীয় তাঁতশিল্পের এই ছবির পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একাধিক সমস্যা। সমুদ্রগড়, শ্রীরামপুর, ধাত্রীগ্রামের মতো তাঁত অধ্যুষিত এলাকায় একের পর এক তাঁত বন্ধ হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। কাজের অভাবে এলাকার বহু তাঁতিকে ভিনরাজ্যে গিয়ে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজও করতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের একাংশের বক্তব্য, স্থানীয় তাঁতের শাড়ির ঐতিহ্য থাকলেও বর্তমান বাজারে ক্রেতাদের পছন্দ বদলেছে। আধুনিক ডিজাইন, হালকা কাপড় এবং তুলনামূলক কম দামের শাড়ির চাহিদা বেড়েছে। ফলে বাইরের রাজ্য থেকে শাড়ি এনে ব্যবসা করতে হচ্ছে অনেককে। ক্রেতা পিঙ্কি হাজরা বলেন, “সিল্ক শাড়ি নিয়েছি আমি তাঁত বাদ দিয়ে। তার কারণ অনেক অপশন পাচ্ছি, আর ব্যবহারেও অনেক সুবিধা।”
তাঁতশিল্পের এই পরিবর্তন শুধু ব্যবসার হিসাবেই আটকে নেই, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু পরিবারের জীবিকা। তাঁতিদের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি। রাজনৈতিক পালাবদলের আগে দীর্ঘ সময়ের শাসনকালে তাঁতশিল্পের যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা এখনও কাটেনি বলেই তাঁদের দাবি। বর্তমানে নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন তাঁতি ও ব্যবসায়ীদের একাংশ। তাঁদের দাবি, বাইরে থেকে যে ধরনের শাড়ি এনে বিক্রি করতে হচ্ছে, সেগুলির উৎপাদনকারী কারখানা যদি এ রাজ্যেই তৈরি হয়, তাহলে স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়বে, তাঁতিরা কাজ পাবেন এবং ভিনরাজ্যে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতাও কমতে পারে।
হাট কর্তৃপক্ষ সুবীর কর্মকার বলেন, “হ্যান্ডলুম যেহুতু বন্ধের মুখে সেই কারণেই ভিন রাজ্য-সহ বিদেশের কাপড়ের চাহিদা এখানে বেশি। শুধু এখানেই নয়, গোটা রাজ্যে একই অবস্থা। তাঁতিরা যাতে বাঁচে নতুন সরকারের সেই দিকে একটু ভাবা দরকার।” পুজোর বাজারে ক্রেতাদের পছন্দের এই বদল তাই নতুন করে ভাবাচ্ছে স্থানীয় তাঁতিদের। ক্রেতাদের একাংশের মতে, হস্তচালিত তাঁতের শাড়ির ঐতিহ্য ও মান এখনও আলাদা, কিন্তু নতুন প্রজন্মের পছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজাইন ও বৈচিত্র্য আরও বাড়ানো প্রয়োজন। আর সেই জায়গাতেই এখন বড় প্রশ্ন ঐতিহ্যকে ধরে রেখে আধুনিক বাজারের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে কি? সমুদ্রগড়ের হাটে পুজোর ভিড় যতই বাড়ুক, সেই ভিড়ের মধ্যেই স্থানীয় তাঁতশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আশার পাশাপাশি উদ্বেগও স্পষ্ট।
