আগামী ১৭ নভেম্বর কার্তিক পুজো, ১৮ নভেম্বর কাটোয়ার কার্তিক লড়াই এবং ১৯ নভেম্বর পানুহাটের কার্তিক লড়াইকে কেন্দ্র করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ ও পরিকল্পনার কথা জানানো হয় বৈঠকে।কাটোয়ার এসডিপিও কাশীনাথ মিস্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এবার শোভাযাত্রায় ঠাকুরের উচ্চতা মাটি থেকে ১৪ ফুট এবং চওড়া ৮ ফুটের বেশি করা যাবে না। রাস্তা সরু হওয়ায় এই বিধিনিষেধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শোভাযাত্রায় ট্রেলার, লরি ও বড় ট্রাক্টর ব্যবহার করা যাবে না। প্রদর্শনীর ট্যাবলো বা আইটেমের সংখ্যাও চারটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি নির্দেশিকা মেনে ডিজে, জেবিএল বক্স, ক্রেন, জেসিবি ও হাইড্রার মতো যন্ত্র ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞার কথা জানানো হয়।
শোভাযাত্রার সময় নিয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে পুলিশ। এসডিপিও জানান, প্রত্যেক পুজো কমিটিকে বিকেল ৫টার মধ্যে মূল শোভাযাত্রার রুটে প্রবেশ করতে হবে। পুরনো নির্ধারিত রুটেই এবারের শোভাযাত্রা হবে। গত বছরগুলিতে গভীর রাত পর্যন্ত শোভাযাত্রা চলায় দর্শনার্থী ও পুলিশের সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি ১২টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত আধ ঘণ্টার নির্দিষ্ট খাবারের বিরতি রাখার প্রস্তাব দেন। তাঁর বক্তব্য, এতে পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি শোভাযাত্রা এগিয়ে নিয়ে যেতেও সুবিধা হবে। কোনও কমিটির বিশেষ প্রয়োজন থাকলে আগে থেকে থানার সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ফেরিঘাটগুলির উপরেও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। শাঁখাই ও বল্লভপাড়া ফেরিঘাটে নৌকার নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী তোলা যাবে না। প্রয়োজনে অতিরিক্ত নৌকার ব্যবস্থা করতে হবে। পর্যাপ্ত কর্মী, লাইফ জ্যাকেট, আলো ও প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনও মাঝি বা বোটম্যান মদ্যপ অবস্থায় থাকতে পারবেন না। পাশাপাশি রেলগেট ও রেলস্টেশন এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের জন্য রেল কর্তৃপক্ষকেও অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিদ্যুতের তার, ঝুলন্ত কেবল ও রাস্তার অন্যান্য বাধা সরাতে পুলিশ, বিদ্যুৎ দফতর, দমকল এবং বাজার কমিটিকে নিয়ে যৌথ রুট পরিদর্শনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
কাটোয়া থানার আইসি সঞ্চয়ন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, প্রত্যেক পুজো কমিটিকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে পুলিশের কাছে অনুমতি নিতে হবে। শেষ মুহূর্তে অনুমতি ছাড়া কোনও নতুন শোভাযাত্রা বের করলে নিরাপত্তা ও পুলিশি ব্যবস্থাপনায় সমস্যা তৈরি হয়। প্রতিটি কমিটির সঙ্গে পুলিশ বা সিভিক ভলান্টিয়ার যুক্ত থাকবেন। শোভাযাত্রায় পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক রাখার পাশাপাশি আলাদা করে লাইট ও গাড়ির মেকানিক রাখার পরামর্শও দেন তিনি। পুলিশকর্মীদের সঙ্গে অযথা বচসায় না জড়িয়ে কোনও সমস্যা হলে সরাসরি থানার সঙ্গে যোগাযোগ করার আবেদন জানান আইসি।
বৈঠকে বড় ঘোষণা করেন কাটোয়ার বিধায়ক কৃষ্ণ ঘোষ। তিনি জানান, কার্তিক পুজোর অনুমতি ফি সম্পূর্ণ মুকুব করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে যে কমিটিগুলি ফি জমা দিয়েছে, তারাও কীভাবে সেই টাকা ফেরত পাবে, তা প্রশাসনের আধিকারিকরা জানিয়ে দেবেন। পাশাপাশি কাটোয়ার পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার উপর জোর দেন বিধায়ক। তাঁর প্রস্তাব, আগামী বছর থেকে সম্ভব হলে কাঁধে করে কার্তিক ঠাকুর নিয়ে যাওয়ার প্রাচীন রীতিতে ফিরে আসা হোক। এ বিষয়ে পুজো কমিটিগুলির মতামতও চান তিনি। তাঁর বক্তব্য, শুধু ডিজে বাজিয়ে বা আনন্দ-উল্লাস করলেই উৎসবের আসল আনন্দ পাওয়া যায় না, কাটোয়ার নিজস্ব ঐতিহ্যকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে, এবারের কার্তিক লড়াইয়ে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও সময় মেনে শোভাযাত্রা সম্পন্ন করাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। ঐতিহ্যের এই উৎসবকে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে পুজো কমিটি, সাধারণ মানুষ এবং প্রশাসনের সমস্ত বিভাগের সম্মিলিত সহযোগিতার উপরেই জোর দেওয়া হয়েছে।
বনোয়ারীলাল চৌধুরী
