Last Updated:
Mining Safety Innovation: খনি দুর্ঘটনার ভয়াবহ স্মৃতি থেকে জন্ম নিল যুগান্তকারী আবিষ্কার! অনিয়ন্ত্রিত কেজের পতন আটকে খনিশ্রমিকদের প্রাণ বাঁচাতে ‘অটোমেটিক কেজ সেফটি সিস্টেম’ তৈরি করলেন বর্ধমানের প্রবীণ ইঞ্জিনিয়ার প্রশান্তকুমার ভট্টাচার্য। মিলল সরকারি পেটেন্ট।
বর্ধমান, পূর্ব বর্ধমান, বনোয়ারীলাল চৌধুরী: গভীর ভূগর্ভস্থ খনিতে কাজ করা শ্রমিকদের জীবন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। কর্মজীবনে একাধিক সহকর্মীর মর্মান্তিক মৃত্যু এবং খনি দুর্ঘটনা তাঁকে দীর্ঘদিন ভাবিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই খনিশ্রমিকদের জীবনরক্ষায় স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ। দীর্ঘ গবেষণার পর বর্ধমানের বাসিন্দা তথা প্রবীণ মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার প্রশান্তকুমার ভট্টাচার্য উদ্ভাবন করেছেন ‘অটোমেটিক মাইন কেজ ফ্রি-ফল অ্যারেস্টিং সেফটি সিস্টেম’।
তাঁর এই আবিষ্কারকে ইতিমধ্যেই স্বীকৃতি দিয়েছে ভারত সরকারের পেটেন্ট দফতর। মিলেছে পেটেন্ট নম্বর ৬০২০৬১১। গভীর ভূগর্ভস্থ খনিতে শ্রমিকদের ওঠানামার জন্য ব্যবহার করা হয় ডুলি বা কেজ। উল্লম্ব খাদ দিয়ে ওঠানামার সময় কোনও কারণে ওয়াইন্ডিং রোপ বা সাপোর্ট সিস্টেম থেকে কেজটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে নিচে পড়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সেই পরিস্থিতিতেই শ্রমিকদের প্রাণরক্ষার জন্য কাজ করবে প্রশান্তবাবুর উদ্ভাবিত এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রশান্তকুমার ভট্টাচার্যের তৈরি প্রযুক্তিতে কেজের সঙ্গে বিশেষ স্বয়ংক্রিয় মেকানিজম যুক্ত থাকবে। কোনও কারণে কেজটি রোপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে নামতে শুরু করলে কোনও মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই মেকানিজমটি সক্রিয় হয়ে উঠবে। এরপর পাশের চারটি গাইডকে শক্তভাবে চেপে ধরে কেজটির অনিয়ন্ত্রিত পতন আটকে দেবে। অর্থাৎ বিপদের মুহূর্তে শূন্যপথে ছুটে চলা কেজকে থামিয়ে শ্রমিকদের প্রাণরক্ষার সুযোগ তৈরি করবে এই ব্যবস্থা।
শুধু কেজের পতন আটকানো নয়, দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে এই প্রযুক্তিতে। স্বয়ংক্রিয় অডিও-ভিস্যুয়াল সিগন্যালিংয়ের মাধ্যমে খনির উপরিতলের আধিকারিক এবং রেসকিউ টিমকে দ্রুত সতর্কবার্তা পাঠানো হবে। ফলে দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ধারকারী দল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে। এই আবিষ্কারের পিছনে রয়েছে প্রশান্তবাবুর দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা। আমলাবাদ ও জামাডোবায় খনির কাজে দুর্ঘটনায় কর্মীদের মৃত্যু এবং খাস কাজোরা কোলিয়ারির মতো দুর্ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ১৯৯৬ সালে ইসিএলের জে কে নগর ৪ নম্বর পিট প্রজেক্ট থেকে অবসর নেওয়ার পর থেকেই তিনি খনিশ্রমিকদের জন্য এমন একটি স্বয়ংক্রিয় জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা তৈরির কথা ভাবতে শুরু করেন। ২০১৫ সালে পরিণত বয়সে সেই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য গবেষণা ও কাজ জোরদার করেন।তবে আবিষ্কারের পথও ছিল যথেষ্ট কঠিন। কোভিড মহামারীর সময় কর্মী ও যাতায়াতের সমস্যায় কাজ প্রায় থমকে যায়। পরে গলিগ্রাম ও পামড়ার ফ্যাক্টরিতে স্ক্র্যাপ মেটেরিয়াল ব্যবহার করে মডেল তৈরির কাজ এগিয়ে নিয়ে যান তিনি। বেনু, নারু গোপাল মিস্ত্রি, ঝুলন মিস্ত্রি এবং গাড়ির চালক উজ্জ্বল ও উত্তম তাঁকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। তাঁর স্ত্রী প্রতিমা ভট্টাচার্যও পুরো যাত্রায় পাশে ছিলেন এবং পেটেন্টে তাঁর নামও যৌথভাবে রয়েছে।
এই আবিষ্কারের স্বীকৃতি হিসেবে বর্ধমানের জি টি রোডের নক্ষত্র সভাঘরে আয়োজন করা হয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের। সেখানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. অরিজিৎ চট্টোপাধ্যায় প্রশান্তকুমার ভট্টাচার্যকে উত্তরীয় ও স্মারক দিয়ে সংবর্ধিত করেন। পাশাপাশি একটি হাসপাতালের প্রতিনিধিরা, পরিবারের সদস্য এবং শুভানুধ্যায়ীরাও তাঁকে সম্মান জানান। প্রশান্তবাবুর কথায়, এই আবিষ্কার তাঁর একার কৃতিত্ব নয়। বহু মানুষের সহযোগিতা এবং পরিবারের নিরন্তর সমর্থনের ফলেই দীর্ঘদিনের ভাবনা বাস্তব রূপ পেয়েছে। তবে তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি পেটেন্ট নয়,কর্মজীবনে চোখের সামনে দেখা দুর্ঘটনার স্মৃতি থেকে জন্ম নেওয়া একটি প্রযুক্তি যদি ভবিষ্যতে কোনও খনিশ্রমিকের প্রাণ বাঁচাতে পারে, সেটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্য।

