রুশ প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের যুক্তি, ভারতের শুধুমাত্র রাফাল এবং তেজসের মতো ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের উপর নির্ভর করে থাকা উচিত নয়। তাঁদের বক্তব্য, চিন ও পাকিস্তান পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান মোতায়েন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতকেও যত দ্রুত সম্ভব স্টেলথ যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। রাশিয়া এই ক্ষেত্রে Su-57E-কে সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে।
প্রয়োজন ৪২টি স্কোয়াড্রন, কিন্তু বায়ুসেনার হাতে রয়েছে মাত্র ২৯টি:
ভারতীয় বায়ুসেনার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হল তার ক্রমহ্রাসমান যুদ্ধক্ষমতা। বায়ুসেনার অনুমোদিত প্রয়োজন ৪২টি স্কোয়াড্রন, অথচ বর্তমানে তাদের হাতে রয়েছে মাত্র ২৯টি স্কোয়াড্রন। এর অর্থ, নির্ধারিত শক্তির তুলনায় অনেক কম সক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে বায়ুসেনাকে।
এই ঘাটতির মধ্যেই ভারতকে দুটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। একদিকে বর্তমান যুদ্ধবিমানের সংখ্যা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী স্টেলথ প্রযুক্তি এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত যুদ্ধবিমানও হাতে পেতে হবে। রুশ বিশ্লেষকদের বক্তব্য, শুধুমাত্র চতুর্থ অথবা ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের সংখ্যা বাড়িয়ে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান থেকে আসা চ্যালেঞ্জের সম্পূর্ণ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
চিনের J-20 ও J-35, পঞ্চম প্রজন্মের দৌড়ে পাকিস্তানও:
ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয় হল, চিন দ্রুত তাদের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। তাদের হাতে ইতিমধ্যেই J-20 স্টেলথ যুদ্ধবিমান রয়েছে। পাশাপাশি J-35 যুদ্ধবিমানও তৈরি করছে এবং সামরিক ব্যবহারের জন্য এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। চিন তাদের বিমানবাহী রণতরী ফুজিয়ানের মাধ্যমেও এই ধরনের নৌবাহিনীর বিমান চলাচল সংক্রান্ত সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানও চিনের J-35 যুদ্ধবিমান পাওয়ার বিষয়ে সহযোগিতার সমঝোতা গড়ে তুলেছে। এর ফলে ভারতের পশ্চিম সীমান্তেও পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে স্টেলথ প্রযুক্তি, আধুনিক রাডার এবং দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত যুদ্ধবিমানের সামনে পুরনো যুদ্ধবিমানের বিপুল সংখ্যাও সবসময় নির্ণায়ক প্রমাণিত হবে না। তাই ভারতের উচিত বায়ুসেনায় পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা।
৫০টি Su-57E কেনা এবং যৌথভাবে ৪৫০টি তৈরির প্রস্তাব:
রাশিয়া ভারতকে Su-57E-এর মাধ্যমে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে। রুশ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে ভারত প্রায় ৫০টি Su-57E যুদ্ধবিমান কিনতে পারে। এরপর ভারতে লাইসেন্সের অধীনে প্রায় ৪৫০টি যুদ্ধবিমান তৈরির বিকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে।
রাশিয়া এই প্রস্তাবকে শুধুমাত্র যুদ্ধবিমান কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না। বরং ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সঙ্গেও যুক্ত করে তুলে ধরছে। রুশ পক্ষের দাবি, ভারত ইতিমধ্যেই Su-30MKI যুদ্ধবিমান তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করছে। যেহেতু Su-57-এর নকশাও সেই একই ডিজাইন ব্যুরো তৈরি করেছে, যারা Su-30MKI তৈরি করেছিল, তাই বর্তমান প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার পরিকাঠামো থেকে কিছুটা সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
তবে ৫০টি যুদ্ধবিমান কেনা এবং ৪৫০টি যুদ্ধবিমান লাইসেন্সের অধীনে তৈরির এই সংখ্যাটি রুশ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রস্তাব মাত্র। একে ভারতের অনুমোদিত পরিকল্পনা বলে মনে করা উচিত নয়।
ভারত নিজেদের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের প্রয়োজন মেটাতে স্বদেশি Advanced Medium Combat Aircraft (AMCA) প্রকল্পের কাজ করছে। ভবিষ্যতে ভারতীয় বায়ুসেনার শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি তৈরি হতে এখনও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
বর্তমান প্রকল্পের সময়সীমা অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ সালের আশপাশে প্রোটোটাইপের প্রথম উড়ানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, বড় আকারে বায়ুসেনায় এই যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া ২০৩৫ সালের পর পর্যন্ত গড়াতে পারে। সময়ের এই ব্যবধানকেই রাশিয়া তাদের Su-57E প্রস্তাবের পক্ষে ব্যবহার করছে। তাদের যুক্তি, AMCA হাতে আসার আগে ভারতের একটি অন্তর্বর্তী পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের প্রয়োজন হতে পারে।
তেজসের চ্যালেঞ্জও বাড়াচ্ছে চাপ:
ভারতের স্বদেশি যুদ্ধবিমান প্রকল্পের সামনেও একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তেজস Mk1A-এর উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে ইঞ্জিন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার সরবরাহে বিলম্বের কারণে এর উৎপাদনের গতি প্রভাবিত হয়েছে।
এই প্রকল্পে মার্কিন সংস্থা GE-এর F404 ইঞ্জিন সরবরাহ এবং ইজরায়েলি AESA রাডার সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে একাধিক চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। এর ফলে এটাও স্পষ্ট যে, স্বদেশি যুদ্ধবিমান তৈরি করা সত্ত্বেও ভারতকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, নৌবাহিনীর জন্য তৈরি তেজসের নৌসেনা সংস্করণকে বিমানবাহী রণতরী থেকে পরিচালনার প্রয়োজনীয়তার নিরিখে উপযুক্ত বলে মনে করা হয়নি। এর পর ভারত দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট Twin Engine Deck Based Fighter (TEDBF) প্রকল্পের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই প্রকল্পের ফলে স্বদেশি নৌসেনার যুদ্ধবিমান সক্ষমতা অর্জনের সময়সীমাও আরও পিছিয়ে গিয়েছে।
রাশিয়ার কাছ থেকে কিনবে, নাকি স্বদেশি AMCA-র জন্য অপেক্ষা করবে ভারত?
ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু একটি নতুন যুদ্ধবিমান বেছে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাৎক্ষণিক সামরিক প্রয়োজন, দীর্ঘমেয়াদি আত্মনির্ভরতা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখা যায়, সেই সিদ্ধান্তও নিতে হবে।
রাশিয়ার Su-57E প্রস্তাবের দাবি, এর মাধ্যমে ভারত কম সময়ের মধ্যে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা অর্জনের বিকল্প পেতে পারে। অন্যদিকে, AMCA-র মতো স্বদেশি প্রকল্প ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতার পথ খুলে দিতে পারে। রাফাল, তেজস এবং Su-30MKI-এর মতো বর্তমান যুদ্ধবিমানগুলির ভূমিকাও এই সামগ্রিক কৌশলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
বর্তমানে Su-57E নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত কেনার সিদ্ধান্তের কোনও নিশ্চয়তা মেলেনি। তবে চিন ও পাকিস্তানের পরিবর্তিত আকাশপথের সামরিক শক্তির প্রেক্ষাপটে এই বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে যে, ভারতের কি নিজেদের স্বদেশি পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের জন্য অপেক্ষা করা উচিত, নাকি ততদিনে কোনও বিদেশি স্টেলথ যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
