Last Updated:
পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষের বাদুলিয়া গ্রামের সাবির হোসেন রক্তপাত বন্ধের প্রযুক্তি আবিষ্কার করে সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় গ্র্যান্ড বিজয়ীর সম্মান অর্জন করেছেন। তাঁর এই উদ্ভাবন স্বাস্থ্য ও জীবনবিজ্ঞান বিভাগে সেরার স্বীকৃতি পেয়েছে।
খণ্ডঘোষ, পূর্ব বর্ধমান, বনোয়ারীলাল চৌধুরী: ছোটবেলার একটা দুর্ঘটনা বদলে দিয়েছিল জীবনের লক্ষ্য। বাবার রক্তাক্ত অবস্থায় অসহায় হয়ে পড়ার সেই স্মৃতি থেকেই মনে জন্মেছিল এক প্রশ্ন, কীভাবে দ্রুত বন্ধ করা যায় রক্তপাত? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু হয়েছিল গবেষণা। আর আজ সেই গবেষণাই পৌঁছে দিল আন্তর্জাতিক সাফল্যের শিখরে। সিঙ্গাপুরের মঞ্চে আন্তর্জাতিক ডিপ টেক প্রতিযোগিতায় গ্র্যান্ড বিজয়ীর সম্মান অর্জন করলেন পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষের বাদুলিয়া গ্রামের সাবির হোসেন। স্বাস্থ্য ও জীবনবিজ্ঞান বিভাগে সেরার স্বীকৃতি পাওয়ার পাশাপাশি তাঁর উদ্ভাবনের জন্য মিলেছে ৪ লক্ষ সিঙ্গাপুর ডলারের আর্থিক অনুদান।
সাবিরের এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম এবং চিকিৎসা প্রযুক্তি নিয়ে নিরন্তর গবেষণা। রৌরকেলার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসা প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি।
এরপর অধ্যাপক দেবেন্দ্র ভার্মার তত্ত্বাবধানে শুরু করেন রক্তপাত নিয়ন্ত্রণের নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ। সেই গবেষণার ফল হিসেবেই তৈরি হয় বিশেষ ন্যানো-বায়োপলিমার পাউডার। দুর্ঘটনা বা আঘাতের ফলে শরীরের কোনও অংশে রক্তপাত শুরু হলে ক্ষতস্থানে এই উপাদান প্রয়োগ করে দ্রুত রক্তপাত নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করা সম্ভব।
এই প্রযুক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য, এটি ব্যবহারের সময় অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন করে না। বরং ক্ষতস্থানে একটি সুরক্ষামূলক আবরণ তৈরি করে রক্তপাত বন্ধ করতে সাহায্য করে। প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও এমন প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সাবিরের উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় ঔষধ মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বা সিডিএসসিও-র অনুমোদন পেয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
২৫০টিরও বেশি হাসপাতাল এবং একাধিক সেনা ইউনিটে-এর ব্যবহার হয়েছে। ১৫০-র বেশি রোগীর ক্ষেত্রে প্রয়োগের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। এর আগে এই উদ্ভাবনের জন্য দেশের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও স্বীকৃতি পেয়েছেন সাবির। তাঁর কাজের প্রশংসা করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং তিন বাহিনীর প্রধানরা। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার তরফেও ‘স্বপ্ন দেখার সাহস’ পুরস্কার-সহ একাধিক সম্মান পেয়েছেন তিনি।
এবার সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় জয় তাঁর গবেষণাকে আরও বড় পরিসরে পৌঁছে দিল। তাঁর সংস্থা ‘মিরাকলস’-এর কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতেও এই আর্থিক অনুদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে আশা। ডিপ টেক প্রতিযোগিতায় চিকিৎসা, জৈবপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির মতো উন্নত ক্ষেত্রের উদ্ভাবন তুলে ধরেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গবেষকরা।
সেই আন্তর্জাতিক মঞ্চেই নিজের কাজের মাধ্যমে নজর কেড়েছেন বাংলার এই তরুণ গবেষক। বাদুলিয়ার মতো প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক মঞ্চ, সাবিরের এই যাত্রা প্রমাণ করে, বড় স্বপ্ন দেখার জন্য বড় শহরের প্রয়োজন হয় না। মানুষের জীবন বাঁচানোর লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া তাঁর গবেষণা আজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। তাঁর এই সাফল্যে স্বাভাবিকভাবেই গর্বিত খণ্ডঘোষ তথা গোটা পূর্ব বর্ধমান।

