রানি ভালো করেই বুঝতেন যে গায়ের জোরে ব্রিটিশদের হারানো অসম্ভব। বুদ্ধির মারপ্যাঁচে অসম্ভব ধুরন্ধর চাল চাললেন তিনি। রানি রাসমণি ব্রিটিশদের কাছ থেকে বার্ষিক ১০,০০০ টাকার বিনিময়ে ঘুসুরি থেকে মেটিয়াবুরুজ পর্যন্ত পুরো গঙ্গার জলপথের মাছ ধরার অধিকার (ইজারা) কিনে নেন। লিজের সব কাগজপত্র রানির হাতে আসতেই তিনি জেলেদের এক অদ্ভুত নির্দেশ দেন। রানির আদেশে রাতারাতি সেই পুরো এলাকা মোটা লোহার শিকল দিয়ে ঘিরে ফেলা হল। জেলেদের বলা হল তাঁরা যেন শুধু ওই ঘেরাও করা জায়গাটুকুতেই মাছ ধরে। এর ফলে ওই এলাকার ঘাটগুলো দিয়ে সব রকম নৌকা চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। আটকে গেল কোম্পানির বড় বড় মালবাহী জাহাজও।

ক্ষুব্ধ ব্রিটিশ সরকার যখন রানির কাছে এর কৈফিয়ত চায়, তখন রানি রাসমণি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে জবাব দেন যে তিনি চড়া মূল্যে নদীর এই অংশটি ইজারা নিয়েছেন এবং নিজের কেনা সম্পত্তিতে মাছ ধরার সুবিধার্থে ও জেলেদের সুরক্ষায় তিনি শিকল দিয়েছেন। জাহাজ চলাচল করলে মাছ পালিয়ে যাবে এবং জেলেদের জাল ছিঁড়ে ক্ষতি হবে।আইনিভাবে খাতাকলমে রানির যুক্তি অকাট্য হওয়ায় এবং বাণিজ্য বন্ধ হয়ে বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তারা জেলেদের ওপর থেকে অন্যায় “নৌকা কর” প্রত্যাহার করে নেয় এবং রানি রাসমণিও গঙ্গার শিকল সরিয়ে নেন। কলকাতার ইতিহাসে রানি রাসমণির এই পদক্ষেপ ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার অন্যতম সেরা একটি প্রতিরোধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
সহজেই মিটল না ঘটনার জের। আরও ঘোলা হল গঙ্গার জল। যথারীতি রানির তলব পড়ল সর্বোচ্চ আদালতে। তাঁকে আদেশ করা হল লোহার শিকল খুলে দিতে। কিন্তু রানি তাতে নারাজ।বললেন, তিনি ব্রিটিশরাজের থেকে ওই এলাকাটুকু ইজারা নিয়েছেন। নিজের ব্যবসায়িক ও প্রজা স্বার্থে তিনি যা ইচ্ছে, তা করতে পারেন। তাছাড়া কোম্পানির জাহাজ চলাচলের কারণে জেলেদের জাল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মাছেরা এই এলাকায় আসে না। এতে প্রজা এবং রানির-দু’ পক্ষেরই ব্যবসায়িক ক্ষতি। তাছাড়া এমন কাজ তিনি ইচ্ছা করে করেননি বরং কোম্পানি তাঁকে বাধ্য করেছে। এই বাঁধ তিনি তখনই ওঠাবেন যখন তার প্রজাদের উপর আরোপ করা কর উঠিয়ে নেওয়া হবে। রানীর বুদ্ধির প্যাঁচে হার মানতে বাধ্য হল কোম্পানি। জেলেদের উপর সকলপ্রকার কর উঠিয়ে নেওয়া হল এবং রানিকে ইজারা বাবদ ১০ হাজার রুপি ফেরত দেওয়া হল।
ব্রিটিশদের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার পর্ব মেটেনি এখানেই। একবার রানির বাড়ি থেকে গঙ্গা পর্যন্ত দুর্গাপুজোর শোভাযাত্রা বার হয়। পথে কোম্পানির সৈন্যরা বাধা দেয়। তাদের অভিযোগ, ঢাক ও কীর্তনের তীব্র শব্দে বাবুদের পাড়ার শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছিল। যথা সময়ে এ খবর রানির কানে গেল। প্রতিবাদ হিসেবে রানি তাঁর লোকদের পাল্টা আরও বড়সড় মিছিল বার করার নির্দেশ দেন। এর পর কোম্পানির প্রশাসনিক কর্তারা রানির বাড়িতে নোটিস নিয়ে এলে, রানি তাদের চোখের সামনেই সেই নোটিস কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলেন। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অবমাননা করার জন্য রানিকে ৫০ রুপি জরিমানা করা হয় এবং রানী সাথে সাথে সেটা দিয়েও দেন। কিন্তু ঝামেলার সুতো গড়াল বিস্তর।
এত সহজে রানি ব্রিটিশরাজকে ছেড়ে দেবেন, তা তো হয় না। এবারও রানি আরও অভিনব পথ ধরলেন। তাঁর প্রাসাদ থেকে নিউমার্কেট হয়ে বাবুবাজার পর্যন্ত সবগুলো রাস্তা কাঠের বেড়া দিয়ে আটকে দিলেন। এর ফলে শহরের উত্তর এবং দক্ষিণকে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ তিন রাজপথই ঘেরাও করা এলাকার মধ্যে পড়ে গেল। ফলে শহরের পরিবহণ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ল। যথারীতি ফের কোম্পানি রানির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিল।
রানি জবানবন্দিতে বলেন, তাঁর প্রাসাদ থেকে নিউমার্কেট হয়ে বাবুঘাট পর্যন্ত ঘেরাও করে রাখা এলাকা তাঁর পারিবারিক সম্পত্তি। তিনি নিজের এলাকার মধ্যে থেকে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করেছেন মাত্র। অন্যের এলাকায় গিয়ে কিছু করেননি। তাঁর জোরালো দাবি, এক্ষেত্রে বরং সরকারই দোষী। কারণ সরকারের পদক্ষেপে খর্ব হয়েছে নাগরিক-অধিকার। আরও একবার ব্রিটিশরাজকে রানির তীক্ষ্ণ এবং যুক্তির কাছে হার মানতে হল। আদালতের নির্দেশে কোম্পানি বাধ্য হয় সেই জরিমানার অর্থ রানি রাসমণিকে ফেরত দিতে। পাশাপাশি রানি রাসমণি আশ্বাস পান বাধামুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন ভাবে ধর্মীয় আচার আচরণ পালন করার।
প্রসঙ্গত ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে গ্রামের বালিকা রানি রাসমণির বিয়ে হয় কলকাতার জানবাজারের জমিদার বাবু রাজচন্দ্র দাসের সঙ্গে। নিম্নবিত্ত পরিবারের কন্যা ধীরে ধীরে মানিয়ে নেন উচ্চবিত্ত পরিবারে। ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে স্বামীকে হারান তিনি। তার পর নিছক কালস্রোতে গা না ভাসিয়ে তিনি পাড়ি দেন উজান স্রোতে। শক্ত হাতে হাল ধরেন জমিদারির। শুধু হাল ধরাই নয়। শ্বশুরকুলের জমিদারিকে বিস্তৃত করেন বহু দূর পর্যন্ত। আভিজাত্যের আবেশে তিনি ছিলেন নূতনের পূজারী। সতীদাহ প্রথা রদ ও বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়নের সংগ্রামের পাশে থাকা এক আলোর পথের দিশারী।
