Last Updated:
Pather Panchali: অপু-দুর্গার কাশবনের ফাঁক দিয়ে দৌড় ও ট্রেন দেখার সেই কালজয়ী দৃশ্য! সত্যজিৎ রায়ের প্রথম সিনেমা ‘পথের পাঁচালী’র প্রথম দিনের শুটিং স্পট পালসিটে কীভাবে আটকে গিয়েছিল শুট? জানুন ঐতিহাসিক ‘লালবাড়ি’র রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
পালসিট, বনোয়ারীলাল চৌধুরী: শারদোৎসব এলেই বাঙালির মনে ভেসে ওঠে কাশবনের ফাঁক দিয়ে অপু-দুর্গার দৌড়, দূরে ছুটে চলা রেলগাড়ি আর সেই চিরপরিচিত দৃশ্য। প্রায় সাত দশক আগে পূর্ব বর্ধমানের পালসিটে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’-র সেই ঐতিহাসিক দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল। বর্তমানে সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়েছে চারপাশের পরিবেশ, হারিয়েছে বিস্তীর্ণ কাশবনও। তবে পালসিটে আজও টিকে রয়েছে সেই স্মৃতির অন্যতম সাক্ষী ‘লালবাড়ি’।
সমাজকর্মী তথা স্থানীয় বাসিন্দা সন্দীপন সরকার বলেন, সত্যজিৎ রায়ের জীবনের প্রথম সিনেমা ‘পথের পাঁচালী’-এর প্রথম দিনের প্রথম শুটিংটা হয়েছিল এই পালসিটে। যে লালবাড়ি রয়েছে এখানেই একসময় সিনেমার শুটিং চলাকালীন সত্যজিৎ রায় অপেক্ষা করতেন। খুব সম্ভবত ১৯৫৩ সালের নভেম্বর মাসে জগদ্ধাত্রী পুজোর দিন উনি প্রথম এখানে আসেন শুটিংয়ের জন্য এবং প্রথম দিন শুটিংটা কমপ্লিট না করতে পারার জন্য ঠিক তার সাতদিন পরে উনি আবার এখানে আসেন। কিন্তু পরের সাতদিন পরে যখন আসেন দেখেন যে সমস্ত কাশবনে যে কাশফুল আমরা দেখতে পাই, সেটা গরুতে খেয়ে নিয়েছে।
ফলে ওই দিনটা উনি শুটিং কমপ্লিট করতে পারেননি এবং এক বছর ওনাকে ওয়েট করতে হয় ওই সেম লোকেশনে শুটটাকে পুরো কমপ্লিট করার জন্য। ১৯৫৪ সালের অক্টোবর মাসে উনি আবার এখানে আসেন এবং শুটিংটা উনি কমপ্লিট করেন। এখান থেকে যে শক্তিগড় স্টেশন রয়েছে তার মধ্যবর্তী যে ট্রেন চলাচল করে, সেখানেই শুটিংটা হয়েছিল বলে আমরা যতদূর জানি।” একসময় রেলস্টেশন সংলগ্ন এই বাড়িটিই ছিল শুটিং ইউনিটের অপেক্ষা ও বিশ্রামের জায়গা। স্থানীয়দের কাছে তাই বাড়িটি শুধু একটি পুরনো পরিত্যক্ত স্থাপনা নয়, ‘পথের পাঁচালী’-র সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ঐতিহাসিক স্মৃতি। বর্তমানে বাড়িটি জীর্ণ, চারপাশে ঝোপঝাড়। উন্নয়ন ও রেলের সম্প্রসারণের কারণে একসময় বাড়িটি ভেঙে ফেলার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি, বাড়িটিকে সংরক্ষণ করে সেখানে তৈরি করা হোক ছোট মিউজিয়াম বা গ্যালারি।
সন্দীপন সরকার আরও বলেন, “রেলের কাছে দাবি জানিয়েছিলাম যাতে এই বাড়িটা রেখে একটা সৌন্দর্যায়ন করা যায়। আমরা এখনও আশা রাখছি যে এটা হবে এবং বাড়িটা এখনও অক্ষত রয়েছে, যেখানে সত্যজিৎ রায়, তার স্ত্রী এবং তার পুরো ইউনিটের অনেকেই এখানে ওয়েট করেছিলেন ওই শুটিং চলাকালীন সময়ে। কারণ সেই সময় তো এখানে ততটা হোটেল বা রেস্ট রুম বা এই জাতীয় কিছু ছিল না। এই বাড়িটারই একটা কিন্তু আমরা গ্যালারি বানাতে পারি, মিউজিয়াম বানাতে পারি। আমরা রেলকে রিকোয়েস্ট করব যদি এটা করে, কারণ এখানটাকে নিয়ে পুরো পালসিটের একটা গরিমা রয়েছে এবং সত্যজিৎ রায়ের মতো এত বড় মাপের একজন ডিরেক্টর তার জীবনের প্রথম দিনের প্রথম সিনেমার প্রথম শুটিংটা কিন্তু এখানে উনি করতে এসেছিলেন, এটা অনেকেই জানে না। এটা মানুষকে আরও প্রচার করলে আমার মনে হয় অনেক মানুষ এখানে আরও আসবেন এবং পুজোর সময় এই যে ঐরকম একটা ঐতিহ্যবাহী সিন, সেটাকে আবার রিক্রিয়েট করতে অনেকে চেষ্টা করবেন।”
আজ আর সেই সময়ের বিস্তীর্ণ কাশবন নেই, বদলে গিয়েছে চারপাশের ভূগোলও। জাতীয় সড়ক, ধানজমি, কর্ড লাইন আর বসতি ঘিরে পালসিটের সেই পুরনো দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে। তবু রেললাইনের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ‘লালবাড়ি’ যেন এখনও মনে করিয়ে দেয়, এই মাটিতেই একদিন ক্যামেরা হাতে এসেছিলেন সত্যজিৎ রায়। আর দুর্গাপুজোর মরশুমে অপু-দুর্গার সেই দৌড়ের স্মৃতি যেন আজও ফিরে আসে পালসিটের বাতাসে।
