সালটা ১৯০৪। বর্ধমানে আসছেন ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন বড়লাট লর্ড কার্জন। রাজা বিজয়চাঁদ মহতাবকে ‘রাজাধিরাজ’ উপাধিতে ভূষিত করার উপলক্ষে বর্ধমানজুড়ে তখন সাজ সাজ রব। তৈরি হয়েছে বিশাল তোরণ, যার নাম কার্জন গেট। চারদিকে উৎসবের আবহ, রাজকীয় আয়োজন। অতিথি আপ্যায়নেও যে থাকতে হবে বিশেষত্ব, তা বলাই বাহুল্য।
কিন্তু রাজকীয় ভোজে পরিবেশন করা হবে কী? এমন কিছু চাই, যা স্বাদে অনন্য, দেখতেও অভিনব। সেই চাহিদা থেকেই ডাক পড়ল বর্ধমানের নামী ময়রা ভৈরবচন্দ্র নাগের। আর তাঁর হাত ধরেই সীতাভোগ ও মিহিদানা পেল এমন এক রূপ, যা পরবর্তী সময়ে বর্ধমানের পরিচয় হয়ে উঠল।
বর্ধমানের রাজপরিবারের মিষ্টি প্রস্তুতকারক পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সীতাভোগ-মিহিদানার ইতিহাস। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ভৈরবচন্দ্র নাগের দাদু শ্রীনাথ নাগ প্রথম এই দুই মিষ্টি তৈরি করেছিলেন। তবে সেই মিষ্টির গড়ন ছিল অনেকটা পান্তুয়া ও বোঁদের মতো। পরে বড়লাটের আগমন উপলক্ষে ভৈরবচন্দ্র নাগ মিষ্টি দুটির রূপ ও পরিবেশনে পরিবর্তন আনেন। সেই নতুন রূপই ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
একদিকে সীতাভোগ—সাদা ভাতের মতো দেখতে, নরম ও মিষ্টি। অন্যদিকে মিহিদানা—অসংখ্য ক্ষুদ্র দানার সমাহার, যার প্রতিটি দানায় মিশে থাকে মিষ্টির স্বতন্ত্র স্বাদ। দেখতে আলাদা, অথচ নাম উচ্চারণে পাশাপাশি—বর্ধমানের এই জুটি যেন বাঙালির মিষ্টিপ্রেমের এক অনন্য উদাহরণ।
সীতাভোগ-মিহিদানার বিশেষত্ব শুধু তার ইতিহাসে নয়, তৈরির কৌশলেও। প্রচলিত পদ্ধতিতে গোবিন্দভোগ, কামিনীভোগ বা বাসমতীর মতো সুগন্ধি চাল গুঁড়ো করে তার সঙ্গে বেসন মেশানো হয়। রং ও সুগন্ধের জন্য যোগ করা হয় জাফরান। নির্দিষ্ট অনুপাতে জল মিশিয়ে তৈরি করা হয় মিশ্রণ। এরপর ছিদ্রযুক্ত পাত্রের সাহায্যে মিশ্রণটি ফুটন্ত ঘিয়ের মধ্যে ফেলা হয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানা ভেজে চিনির রসে ডুবিয়ে তৈরি হয় মিহিদানা। সীতাভোগের প্রস্তুতিপদ্ধতি ও গড়নে রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। উপকরণের অনুপাত, মিশ্রণের ঘনত্ব এবং ভাজার কৌশল—প্রতিটি ধাপেই দরকার অভিজ্ঞ হাতের ছোঁয়া।
সীতাভোগের নামকরণ নিয়েও রয়েছে নানা মত। অনেকে মনে করেন, ‘সীতাশাল’ চালের নাম থেকেই সীতাভোগ নামটির উৎপত্তি। তবে এই নামকরণের ইতিহাস নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করা জরুরি।
কথিত আছে, বর্ধমানে এসে সীতাভোগ-মিহিদানা খেয়ে লর্ড কার্জন এর স্বাদ ও অভিনবত্বের প্রশংসা করেছিলেন। সেই রাজকীয় স্বীকৃতির গল্প প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বর্ধমানের মিষ্টির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজকীয় ভোজের গণ্ডি পেরিয়ে এই দুই মিষ্টি পৌঁছে গিয়েছে সাধারণ মানুষের ঘরে, উৎসবের থালায় এবং উপহার দেওয়ার তালিকায়।
বর্ধমানের সীতাভোগ-মিহিদানা আজ শুধু স্থানীয় মিষ্টি নয়, বাংলার খাদ্যসংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জিআই স্বীকৃতি এই দুই মিষ্টির পরিচিতি ও স্বতন্ত্র ঐতিহ্যকে আরও প্রতিষ্ঠা করেছে। সংরক্ষণ ও পরিবহণের সুবিধা বাড়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশেও পৌঁছে যাচ্ছে বর্ধমানের এই মিষ্টি।
সময় বদলেছে, বদলেছে মিষ্টি তৈরির পদ্ধতি ও বিপণনের পরিসর। কিন্তু সীতাভোগ-মিহিদানার প্রতি বাঙালির টান আজও অমলিন। এক ঐতিহাসিক শহর, এক রাজকীয় আয়োজন এবং এক ময়রার সৃষ্টিশীলতা—সব মিলিয়ে সীতাভোগ-মিহিদানা শুধু রসনার তৃপ্তি নয়, বহন করে বাংলার মিষ্টি ঐতিহ্যের গল্পও। তাই বিজয়ার মিষ্টির থালায় এই দুই মিষ্টি থাকলে, তার সঙ্গে পরিবেশন করা যায় ইতিহাসের এক টুকরো স্বাদও।
