Last Updated:
Business Idea: শারদোৎসব থেকে কালীপুজো ও জগদ্ধাত্রী পুজো, উৎসবের মরশুমে প্রতিমার চালচিত্র বা বাঁশের চালি তৈরির ব্যবসা এক লাভজনক কুটিরশিল্পে পরিণত হয়েছে। কৃষ্ণনগরের বাগদীপাড়ার কারিগরদের মতো জাওয়া বাঁশ দিয়ে নিখুঁত মাপের চালি বানিয়ে এই খাতে দারুণ আর্থিক লাভের মুখ দেখতে পারেন উদ্যোক্তারা।
কৃষ্ণনগর, নদিয়া, মৈনাক দেবনাথ: শারদোৎসব থেকে শুরু করে আসন্ন কালীপুজো—উৎসবের মরশুমে প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি প্রতিমার পিছনের বাঁশের চালি বা চালচিত্রের কাঠামো তৈরির কাজে চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষ্ণনগরের শিল্পীরা। নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর পৌরসভার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাগদীপাড়া এলাকায় বংশপরম্পরায় গড়ে উঠেছে প্রতিমার এই চালি তৈরির ঐতিহ্যবাহী শিল্প।
বাগদীপাড়ার স্থানীয় কারিগর শুভম সাঁতরা জানান, এই পেশা তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। তাঁর জ্যাঠামশাই জয়দেব সাঁতরা এবং বাবা নিরঞ্জন সাঁতরা বহু বছর আগে এই কাজের সূচনা করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শুভম এখন পরিবারের অন্যদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করে চলেছেন। তাঁদের নিপুণ হাতের কাজ ও পরিচিতির জোরেই আজও বিভিন্ন মৃৎশিল্পী ও পূজো উদ্যোক্তারা তাঁদের কাছে ছুটে আসেন।
শুভম সাঁতরার কথায়, এই চালি তৈরিতে মূলত ব্যবহার করা হয় বিশেষ ধরনের ‘জাওয়া বাঁশ’, যা সরাসরি বাঁশের ঝাড় থেকে সংগ্রহ করে আনা হয়। বর্তমানে তাঁদের দলে মোট ছয়জন কারিগর একসঙ্গে কাজ করেন। পরিবারের কাকা বাঁশ কেটে চেঁচে প্রস্তুত করে দেন এবং বাকিরা তা দিয়ে নিপুণভাবে চালি বাঁধাইয়ের কাজ সম্পন্ন করেন। একটি সাধারণ চালি তৈরি করতে গড়ে আড়াই থেকে তিনটি বাঁশের প্রয়োজন হয়। বাঁশ কাটা ও চেঁচে তৈরি থাকলে একটি পূর্ণাঙ্গ চালি জুড়তে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক সময় লাগে।
বর্তমানে তাঁদের কারখানায় মূলত লক্ষ্মী ও কালী প্রতিমার জন্য গোল ও অর্ধচন্দ্রাকার চালি তৈরি হচ্ছে। শুভম জানান, দুর্গাপুজোর ক্ষেত্রে সাধারণত ‘একচালি’ বা বড় অর্ধছাত লাগে, যা আকারে অত্যন্ত বড় হওয়ায় তা অধিকাংশ সময় সরাসরি মণ্ডপে বা প্যান্ডেলে গিয়ে বানাতে হয়। কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় তৈরি করা হয় বিশেষ ধরনের ‘থাক-থাক’ নকশার চালি। স্থানীয় কৃষ্ণনগর শহরের সিংহভাগ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি তাঁদের তৈরি এই বাঁশের কাঠামো রানাঘাট, মুরগাছা এবং চাপড়ার মতো পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। চালি বিক্রির ক্ষেত্রে দর নির্ধারিত হয় মাপ বা ‘হাত’ হিসেবে। সাধারণত ১০, ১২, ১৪ হাত থেকে শুরু করে ২২ হাত পর্যন্ত মাপের চালি তৈরি করা হয়। প্রতি হাতের জন্য গড়ে প্রায় ১০০ টাকা দরে চালি বিক্রি হয়।
তবে উৎসবের মরশুমে পূজার সংখ্যা বাড়লেও কারিগরদের মনে রয়ে গেছে হতাশা। শুভম সাঁতরা ক্ষোভের সঙ্গে জানান, বাজারে বাঁশ, বাঁধাইয়ের দড়ি এবং পেরেকের মতো প্রতিটি কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পূজার সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে চালির উপযুক্ত মূল্য বা পরিশ্রমের ন্যায্য মজুরি মিলছে না। ফলে দিনরাত পরিশ্রম করেও প্রত্যাশিত লাভের মুখ দেখা সম্ভব হচ্ছে না, যা এই ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্পের ভবিষ্যৎকে কিছুটা অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
