চলতি মার্কিন নৌ অবরোধ এড়িয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখার জন্য এই নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার কথা ভাবা হলেও, বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, এই বেছে নেওয়া করিডর থেকে ছাড় পাওয়া দেশ, জাহাজ চলাচলকারী সংস্থা এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজার গভীর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। আল জাজিরা, বিবিসি এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
১. অব্যাহত সামরিক হামলা এবং সংঘর্ষের জেরে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা:
প্রধান পরিচালনাগত বিপদ হল, কাগজে-কলমে ছাড় দেওয়া হলেও ভুল শনাক্তকরণ বা পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ এখনও সক্রিয় সংঘাতের এলাকায় পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।
সামুদ্রিক ড্রোন, সমুদ্রের নীচে পেতে রাখা মাইন এবং উপকূল থেকে জাহাজ লক্ষ্য করে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র তীব্র সংঘাতের পরিস্থিতিতে অনেক সময় জাহাজের জাতীয় পতাকা বা পরিচয় অনুযায়ী লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করতে পারে না।
এই ছাড়ের ঘোষণা আসার ঠিক আগেই ওমানের উপকূলের কাছে ভারতীয় পতাকাবাহী ধৌ (ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ) MSV Al-Jusufi একটি অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনায় এক ভারতীয় নাবিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
২. আমেরিকার ‘সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা’র ফাঁদ:
ইরান দাবি করছে যে, ছাড় পাওয়া জাহাজগুলিকে ‘আমেরিকানরা বাধা দেয় না’। কিন্তু এই বিশেষ ব্যবস্থার ফলে মার্কিন আইনের অধীনে বিপুল আইনি ও আর্থিক দায়বদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
ইরান ভারতীয় ও চিনা জাহাজগুলিকে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার বিনিময়ে সক্রিয়ভাবে ‘ট্রানজিট ফি’ বা পারাপারের মাশুল আদায় করছে। রেডিটের ওয়ার্ল্ডনিউজ কমিউনিটির মতো বিভিন্ন অনলাইন মঞ্চে সামুদ্রিক পরিবহণের উপর নজর রাখা ব্যক্তিরা উল্লেখ করেছেন, ওয়াশিংটন হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, পারাপারের মাশুলের মাধ্যমে ইরান সরকারকে অর্থ জোগান দেয়, এমন যে কোনও আন্তর্জাতিক সংস্থার বিরুদ্ধে অবরোধ এবং কঠোর সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে।
এই করিডর ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক সংস্থাগুলি মার্কিন ডলারে পরিচালিত আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
৩. আকাশছোঁয়া বিমা খরচ এবং যুদ্ধকালীন ঝুঁকির প্রিমিয়াম:
বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল একতরফা কোনও নির্দেশের ভিত্তিতে নয়, বরং আন্তর্জাতিক বিমা সংক্রান্ত নিয়ম ও মানদণ্ড মেনেই পরিচালিত হয়।
কালো তালিকাভুক্ত জলপথ: হরমুজ প্রণালী এখনও অত্যন্ত বিতর্কিত একটি এলাকা এবং সেখানে নৌ অবরোধের পরিস্থিতি রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক বিমা সংস্থাগুলি ইরানের পরিবর্তনশীল ছাড়ের সিদ্ধান্তকে স্বীকৃতি দেবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
অত্যধিক ব্যয়: এই করিডর ব্যবহার করার চেষ্টা করলে জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থাগুলিকে ‘যুদ্ধকালীন ঝুঁকি’র বিমার জন্য বিপুল পরিমাণ প্রিমিয়াম দিতে হবে। এর ফলে বিকল্প সংক্ষিপ্ত জলপথ ব্যবহারের যে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার কথা, তা সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যাবে।
৪. পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক চাপের কাছে দুর্বলতা:
তেহরানের এই নীতি স্পষ্টতই লেনদেনভিত্তিক। সামুদ্রিক পথে চলাচলের অনুমতিকে কূটনৈতিক ও বস্তুগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান।
পাল্টা সুবিধা পাওয়ার উপর নির্ভরশীলতা: ইরান প্রকাশ্যেই জানিয়েছে, ভারতকে এই জলপথ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি ওষুধ আমদানির উপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, চিনের ক্ষেত্রে এই অনুমতি বেজিংয়ের রাজনৈতিক সমর্থনের সঙ্গে যুক্ত।
সাময়িক তালিকা: আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য, ‘বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ’গুলির বিষয়ে তেহরানের তালিকা তাৎক্ষণিক কৌশলগত প্রয়োজনের ভিত্তিতে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়।
ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে হঠাৎ কোনও মতবিরোধ তৈরি হলে কোনও দেশের জন্য দেওয়া ছাড় মুহূর্তের মধ্যে প্রত্যাহার করে নেওয়া হতে পারে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও পণ্যবাহী কন্টেনার জাহাজগুলি সমুদ্রপথে চলাচলের মাঝপথেই আটকে পড়তে পারে।
