Headlines

East Bardhaman News: মঙ্গলকোটের জালপাড়ায় আজও হয় বেহুলা-লখিন্দরের বিয়ে, জানেন এই প্রাচীন লোকাচারের কথা? | পূর্ব বর্ধমান


Last Updated:

East Bardhaman News: পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোটের জালপাড়া গ্রামে মনসা উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ বেহুলা-লখিন্দরের প্রতীকী বিয়ে। স্থানীয় লোকবিশ্বাস ও প্রাচীন লোকাচার ঘিরে আজও জমে ওঠে উৎসব।

মঙ্গলকোটের জালপাড়ায় আজও হয় বেহুলা-লখিন্দরের বিয়ে
মঙ্গলকোটের জালপাড়ায় আজও হয় বেহুলা-লখিন্দরের বিয়ে

মঙ্গলকোট: পৌরাণিক কাহিনির পাতায় বেহুলা-লখিন্দরের প্রেম, বিরহ আর লড়াইয়ের গল্প অমর হয়ে রয়েছে। কিন্তু সেই কাহিনি যদি শুধু বইয়ের পাতায় আটকে না থেকে প্রতি বছর নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে, তাহলে কেমন হয়? পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোটের জালপাড়া গ্রামে গেলে মিলবে সেই উত্তর। এখানে দেবী মনসার আরাধনার পাশাপাশি আজও পালিত হয় বেহুলা ও লখিন্দরের প্রতীকী বিয়ের অনুষ্ঠান। সানাইয়ের সুর, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর সাবেকি বিয়ের রীতিনীতিতে কয়েক ঘণ্টার জন্য যেন ফিরে আসে বাংলার এক প্রাচীন লোককথার জগৎ।

পুরাণের গল্পে মিশে গ্রামের লোকবিশ্বাস

মনসামঙ্গল কাব্যের বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি বাংলার ঘরে ঘরে পরিচিত। চাঁদ সওদাগরের পুত্র লখিন্দর এবং তাঁর স্ত্রী বেহুলার প্রেম, স্বামীর প্রাণ ফিরে পাওয়ার জন্য বেহুলার অসম্ভব লড়াই—এই আখ্যান যুগের পর যুগ ধরে বাঙালির আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। সেই কাহিনির সঙ্গেই নিজেদের গ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে জুড়ে দেখেন মঙ্গলকোটের জালপাড়ার বাসিন্দারা। স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, চাঁদ সওদাগরের পুত্রবধূ বেহুলার বাপের বাড়ি ছিল এই মঙ্গলকোট অঞ্চলেই। সেই বিশ্বাসকে ঘিরেই গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে প্রাচীন মনসা উৎসব। আর এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ বেহুলা ও লখিন্দরের প্রতীকী বিবাহ। লোকবিশ্বাস, পুরাণের স্মৃতি এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এই আয়োজন পেয়েছে এক স্বতন্ত্র পরিচিতি।

মনসা পুজোর পরেই বিয়ের আসর

প্রতি বছরের মতো এবারও সাড়ম্বরে পালিত হয়েছে জালপাড়া গ্রামের মনসা উৎসব। দেবী মনসার পূজার্চনা শেষ হলেই শুরু হয় উৎসবের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্ব। গ্রামের একটি প্রাচীন বটবৃক্ষের তলায় সাজিয়ে তোলা হয় বিয়ের আসর। স্থানীয় লোকাচার ও শাস্ত্রীয় রীতিনীতি মেনে আয়োজন করা হয় বেহুলা-লখিন্দরের প্রতীকী বিয়ের।

সাজসজ্জা থেকে শুরু করে বিয়ের নানা আচার—সবেতেই থাকে সাবেকিয়ানার ছোঁয়া। সানাইয়ের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। শঙ্খধ্বনি আর মহিলাদের উলুধ্বনিতে তৈরি হয় একেবারে বাঙালি বিয়েবাড়ির আবহ। তবে এই বিয়ের আসরের বিশেষত্ব হল, এখানে শুধু দু’জনের বিবাহের আয়োজন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি প্রাচীন কাহিনিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস।

শুধু উৎসব নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঐতিহ্য বহনের গল্প

জালপাড়ার এই আয়োজন দেখতে শুধু গ্রামের বাসিন্দারাই নন, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও বহু মানুষ ভিড় জমান। মনসামঙ্গল কাব্যের স্মৃতি, লোকগীতি, গ্রামীণ মেলা এবং বেহুলা-লখিন্দরের প্রতীকী বিবাহ—সব মিলিয়ে উৎসবের দিনগুলিতে অন্য রূপ নেয় গোটা এলাকা। এই উৎসবের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। জাতি-ধর্মের বিভেদ ভুলে গ্রামের মানুষ একসঙ্গে শামিল হন আয়োজনে। লোকাচারকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় সামাজিক মেলবন্ধনের পরিবেশ। নতুন প্রজন্মের কাছেও এই উৎসব হয়ে ওঠে পূর্বপুরুষদের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ।

আধুনিকতার ভিড়ে লোকসংস্কৃতির নিজস্ব ঠিকানা

সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের জীবনযাপন, উৎসব পালনের ধরনও। আধুনিকতার প্রভাবে বাংলার বহু প্রাচীন লোকাচার আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। কোথাও আবার পুরনো রীতিনীতি টিকে রয়েছে কেবল স্মৃতির মধ্যে। সেই সময়েও মঙ্গলকোটের জালপাড়ায় বেহুলা-লখিন্দরের প্রতীকী বিবাহের আয়োজন এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। এখানে পুরাণের কাহিনি শুধু শোনা বা পড়ার বিষয় নয়, তা যেন প্রতি বছর ছুঁয়ে দেখা যায়। একটি প্রাচীন বটবৃক্ষের তলায় বিয়ের আসর বসে, বাজে সানাই, ওঠে শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনি। লোকবিশ্বাসকে আশ্রয় করে এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকে এক ঐতিহ্য। বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি হয়তো বহুবার বলা হয়েছে, বহুবার লেখা হয়েছে। কিন্তু মঙ্গলকোটের জালপাড়ায় সেই গল্পের এক অন্য রূপ দেখা যায়। যেখানে প্রেমের পৌরাণিক আখ্যানের সঙ্গে মিশে রয়েছে গ্রামের মানুষের বিশ্বাস, আবেগ এবং শিকড়ের টান। তাই এই বিয়ে শুধু প্রতীকী বিবাহ নয়, বাংলার লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত উদযাপন।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *