Last Updated:
দীর্ঘ ১৯ দিনের দুর্গোৎসব, প্রতিদিনের চণ্ডীপাঠ, ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় সজ্জিত ঠাকুরদালান এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা নানা আচার-অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে মেমারির আমাদপুর জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজো আজও বহন করে চলেছে বাংলার বনেদি বাড়ির পুজোর ঐতিহ্য।
চোদ্দো দিন ধরে চলে চণ্ডীপাঠ। প্রাচীন রীতি মেনে আজও বসে নহবত। ঠাকুরদালান ঝলমল করে ঝাড়লণ্ঠনের আলোয়। দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে যেন ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া অতীত। পূর্ব বর্ধমানের মেমারির আমাদপুর জমিদারবাড়িতে আজও সাড়ে তিনশো বছরেরও বেশি প্রাচীন ঐতিহ্য মেনে হয় দুর্গাপুজো। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও এই পুজোয় বরাবরই প্রাধান্য পেয়েছে পুরনো রীতিনীতি। আর সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা।
শোনা যায়, রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি ছিলেন এই পরিবারের সদস্য দোহী সেনশর্মা। তিনি কবি জয়দেবের সহকর্মীও ছিলেন বলে কথিত রয়েছে। পরবর্তী সময়ে মুঘলদের কাছ থেকে এই পরিবারের দুই ভাইয়ের একজন মজুমদার এবং অন্যজন চৌধুরী উপাধি পান।
পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কুলদেবতা রাধামাধবের আগমনের কাহিনিও। মুর্শিদাবাদ থেকে আসার সময় কুলদেবতা রাধামাধবকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন কৃষ্ণ রাম সেনশর্মা। জমিদারবাড়ি তৈরির পাশাপাশি তিনি নির্মাণ করেন রাধামাধবের মন্দির। সেই মন্দিরের বিপরীতে তৈরি হয় দুর্গাদালান। সেখানেই শুরু হয় দুর্গাপুজো। পরে নতুন করে দুর্গাদালান তৈরি করা হলে সেখানে শুরু হয় পুজো। আজও সেই দালানেই মহিষাসুরমর্দিনী রূপে পূজিত হন দেবী দুর্গা।
মেমারির আমাদপুর জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজোয় আজও প্রাচীন রীতিনীতি মেনে দেবীর আরাধনা করা হয়। পরিবারের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, রথের দিন রাধামাধবের রথের চাকার মাটি দিয়ে দেবীমূর্তিতে মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়। সেই দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি।
দুর্গাপুজোর ঠিক ১৪ দিন আগে কৃষ্ণানবমী তিথিতে মহিষাসুরমর্দিনীর বোধন হয়। এরপর প্রতিদিন চলে চণ্ডীপাঠ। সব মিলিয়ে এখানে দুর্গোৎসবের মেয়াদ ১৯ দিন। পুজোর এই দীর্ঘ পর্বে পরিবারের ছোট-বড় সকলেই একসঙ্গে উৎসবে মেতে ওঠেন।
আমাদপুর জমিদারবাড়ির পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব দেবী লক্ষ্মী ও সরস্বতীর প্রতিমা। এখানে তাঁদের কোনও বাহন থাকে না। পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস, বাহন থাকলে লক্ষ্মী ও সরস্বতী অন্যত্র চলে যেতে পারেন। সেই বিশ্বাস থেকেই প্রাচীন রীতি মেনে দুই দেবীর প্রতিমায় বাহন রাখা হয় না।
দেবীর নৈবেদ্যেও রয়েছে বিশেষত্ব। দুর্গাপ্রতিমার সামনে নিবেদন করা হয় এক মণ চালের মহানৈবেদ্য। তার সঙ্গে থাকে ফল ও কাঁচা সব্জি। ভোগে দেওয়া হয় লুচি, মোহনভোগ, ক্ষীর, ছানা, নারকেল নাড়ু ও রসকরা। তবে এখানে অন্নভোগ দেওয়ার রীতি নেই। গোটা ফল এবং সুন্দর করে সাজানো আতপ চাল দিয়েই নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়।
পুজোর আচার-অনুষ্ঠানে পরিবারের মহিলাদেরও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ষষ্ঠীর দিন মাছের ল্যাজা খেয়ে দেবীবরণ করতে যান বাড়ির মহিলারা। প্রতিদিন পুজোর পর বাড়ির ছোট-বড় সদস্যদের নিয়ে বসে নাটক, নাচ, গান ও আবৃত্তির আসর। পুজোর আনন্দে একসঙ্গে মেতে ওঠেন পরিবারের সকলে।
আমাদপুর জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজোয় প্রতিমা নিরঞ্জনের ক্ষেত্রেও মেনে চলা হয় প্রাচীন রীতি। নিরঞ্জনের আগে জ্বালানো হয় মশাল। বাঁশের সাং বেঁধে কাঁধে করে প্রতিমা নিয়ে গোটা গ্রাম ঘোরানো হয়। এরপর হয় প্রতিমা নিরঞ্জন।

