Last Updated:
আধুনিকতার ভিড়ে যখন পুরনো রীতিনীতি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে, তখন বর্ধমানের কাঞ্চননগরের দাস বাড়ি যেন ঐতিহ্য ধরে রাখার এক অনন্য উদাহরণ। তিনশো বছরের দুর্গাপুজো, বাড়িতে তৈরি ধূপ আর প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই আজও বেঁচে রয়েছে পরিবারের ইতিহাস ও পরম্পরা।
ধূপের গন্ধ ছাড়া পুজোর পরিবেশ যেন অসম্পূর্ণ। কিন্তু বাজার থেকে কিনে আনা ধূপ নয়, প্রায় তিনশো বছর ধরে বর্ধমানের কাঞ্চননগরের দাস বাড়ির দুর্গাপুজোয় ব্যবহার করা হয় বাড়িতে তৈরি বিশেষ ধূপ। শ্বেতচন্দন, রক্তচন্দন, অগুরু, মধু, হরিতকি-সহ ১৯ রকমের উপকরণ দিয়ে শুদ্ধাচারে তৈরি হয় এই ধূপ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রীতি আজও অটুট। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাজারে হরেক রকমের ধূপের সম্ভার থাকলেও দাস বাড়ির পুজোয় ঐতিহ্য আর শুদ্ধতার মেলবন্ধনেই জ্বলে তিনশো বছরের পুরনো ধূপ।
দাস বাড়ির ধূপ তৈরির প্রক্রিয়াও বেশ স্বতন্ত্র। জন্মাষ্টমীর দিন পরিবারের সদস্যরা স্নান সেরে শুদ্ধবস্ত্র পরে ধূপ তৈরির কাজে হাত লাগান। তার আগের রাতে গঙ্গাজলে ভিজিয়ে রাখা হয় ধূপ তৈরির প্রাকৃতিক উপকরণগুলি। সকালে সেগুলি শিলে বাটা হয়। এরপর পাটের সঙ্গে সেই উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হয় ধূপ।
শ্বেতচন্দন, রক্তচন্দন, অগুরু, লাক্ষা, মধু, হরিতকি ও ধুনো-সহ মোট ১৯ রকমের উপকরণ ব্যবহার করা হয় এই ধূপ তৈরিতে। রাসায়নিকবিহীন এই ধূপের গন্ধও স্বতন্ত্র। শুধু তাই নয়, একটি ধূপ জ্বলতে সময় লাগে অন্তত তিন ঘণ্টা। দুর্গাপুজোর প্রয়োজনীয় সমস্ত ধূপই তৈরি করা হয় জন্মাষ্টমীর দিন। শুদ্ধতার কথা মাথায় রেখে প্রায় তিনশো বছর আগে বাড়িতেই ধূপ তৈরির প্রথা শুরু হয়েছিল। সেই প্রথা আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছে দাস পরিবার।
বর্ধমানের কাঞ্চননগরের দাস পরিবারের আদি বাস ছিল বাঁকুড়া জেলায়। প্রায় তিনশো বছর আগে পরিবারের সদস্য কিনুরাম দাস বর্ধমানে এসে বসতি গড়েন। তাঁর হাত ধরেই শুরু হয় দুর্গাপুজো। বাড়ির উঠোনে প্রতিষ্ঠা করা হয় পেতলের ছোট্ট দুর্গামূর্তি। সেই মূর্তিকে কেন্দ্র করেই দাস পরিবারে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। সময়ের সঙ্গে বদলেছে অনেক কিছু। কিন্তু দাস বাড়ির পুজোয় আজও অটুট প্রাচীন রীতিনীতি। প্রথা মেনে পাদানির উপর রাখা একুশটি পেতলের পাত্রে দেবীকে ভোগ নিবেদন করা হয়। এই পুজোয় শুরু থেকেই পশুবলি তো দূরের কথা, কোনও ধরনের বলিরই প্রচলন নেই।

