Headlines

বিদ্যাসাগরের স্মৃতি, সত্যজিৎ রায়ের শ্যুটিং, স্থলপদ্মে পুজো! ঐতিহ্যের টানে আজও অনন্য চকদিঘির জমিদারবাড়ি | পূর্ব বর্ধমান


পুরনো রীতি মেনে প্রতিপদ থেকেই শুরু হয় চকদিঘির জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজো। সিংহরায় পরিবারের এই পুজোয় বৈদিক নিয়ম মেনে দেবীর আরাধনা করা হয়। একচালার কাঠামোয় ডাকের সাজে সজ্জিত হন দেবী দুর্গা। প্রতিমার দু’পাশে থাকে জয়া ও বিজয়ার মূর্তি। পুজোর সময়ে মন্দিরচত্বরও সাজানো হয় বিশেষ আঙ্গিকে। একটি গোটা নারকেল, আমপল্লব ও কাঁঠালি কলা একসঙ্গে বেঁধে মন্দিরের প্রতিটি থামে রাখা হয়।

স্থলপদ্মে দেবীর আরাধনা, সন্ধিপুজোয় ১০৮ পদ্ম

চকদিঘির সিংহরায় পরিবারের পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য স্থলপদ্ম দিয়ে দেবীর আরাধনা। তবে সন্ধিপুজোয় নিয়ম মেনে লাগে ১০৮টি জলপদ্ম। নৈবেদ্যে অন্যান্য ফলের পাশাপাশি থাকে কাজু, কিসমিস, পেস্তা, আখরোট ও মেওয়া। চিনির সন্দেশ, ছোট ও বড় মুণ্ডি, ডোনা, নবাত, রসকড়া এবং মুড়কি দিয়ে সাজানো হয় নৈবেদ্য। পুজোর প্রতিদিন দেবীকে নিবেদন করা হয় বিভিন্ন ধরনের নিরামিষ ভোগ। মহাষ্টমী থেকে নৈবেদ্যে যোগ হয় মাখা সন্দেশ।

বলিদানের সময় দেবীকে সন্দেশ দর্শন করানোর রীতিও রয়েছে এই পরিবারে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই আচার-অনুষ্ঠান আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয়।

বিদ্যাসাগরের স্মৃতি জড়িয়ে জমিদারবাড়িতে

চকদিঘির সিংহরায় পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্মৃতি। তিনি বহুবার এই পরিবারের দুর্গাপুজোয় উপস্থিত থেকেছেন বলে জানা যায়। জমিদারবাড়ি লাগোয়া একটি পুকুর ও তার বাঁধানো ঘাট ছিল বিদ্যাসাগরের প্রিয় জায়গা। সেখানে দুটি ঘরও ছিল। ওই জায়গায় বসে তিনি পড়াশোনা ও লেখালেখির কাজ করতেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। বর্তমানে ঘর দু’টি সংস্কারের অভাবে ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় রয়েছে।

সত্যজিৎ রায়ের শ্যুটিংও হয়েছে এই বাড়িতে

চকদিঘির জমিদারবাড়ি শুধু ধর্মীয় ঐতিহ্যের জন্য নয়, চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে। বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় এই বাড়িতে থেকে তাঁর চলচ্চিত্রের শ্যুটিং করেছিলেন। একসময় নিয়মিত সিনেমার শ্যুটিং হতো এই বাড়িতে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কারের অভাবে বাড়িটির বিভিন্ন অংশে বয়সের ছাপ স্পষ্ট হয়েছে। তবুও তার সাবেকি স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।

রাজস্থান থেকে চকদিঘি, কীভাবে উত্থান সিংহরায় পরিবারের?

পরিবারের ইতিহাস অনুযায়ী, চকদিঘির জমিদারদের পূর্বপুরুষ ছিলেন রাজপুত ক্ষত্রিয়। রাজস্থান থেকে নল সিং প্রথম চকদিঘিতে এসে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছ থেকে জমিদারি লাভের পর তাঁর পরিবার বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়।

এই জমিদার বংশের খ্যাতি শীর্ষে পৌঁছয় সারদাপ্রসাদ সিংহরায়ের সময়ে। জমিদার হয়েও তিনি জনসেবামূলক কাজে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এলাকার উন্নয়ন ও শিক্ষাবিস্তারের জন্য স্কুল তৈরির পাশাপাশি চকদিঘি হাসপাতাল এবং বর্তমান মেমারি-চকদিঘি সড়কপথ তৈরিতেও তাঁর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রজাদের কল্যাণে তাঁর ভূমিকা আজও পরিবারের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বদলেছে সময়, রয়ে গিয়েছে প্রথা

সিংহরায় পরিবারের দুর্গাপুজোয় মহিলাদের অংশগ্রহণ ঘিরেও রয়েছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক রীতি। আগে পরিবারের মহিলারা মন্দিরের ভিতরে পর্দা ঘেরা জায়গায় বসে পুষ্পাঞ্জলি দিতেন, যাতে গ্রামের সাধারণ মানুষ তাঁদের দেখতে না পান। সেই প্রথা এখনও চলে আসছে। পরিবারের পুজোর যাবতীয় আয়োজনও পুরনো নিয়ম মেনেই পুরুষ সদস্যরা করে থাকেন।

সংস্কারের অভাবে জমিদারবাড়ির গায়ে সময়ের ছাপ পড়েছে। তবুও বিদ্যাসাগরের স্মৃতি, সত্যজিৎ রায়ের শ্যুটিংয়ের ইতিহাস এবং স্থলপদ্মে দেবীর আরাধনার মতো স্বতন্ত্র রীতিকে সঙ্গী করে আজও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে চকদিঘির সিংহরায় পরিবার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই দুর্গাপুজো তাই কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, এলাকার ইতিহাস ও বনেদি সংস্কৃতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *