Last Updated:
Kali Puja: ঘন জঙ্গল আর দুর্ধর্ষ ডাকাতদের ডেরা থেকে কীভাবে এল দেবীর আরাধনা? ময়ূরেশ্বরের ৩০০ বছরের প্রাচীন ‘ডাকাত কালী’ পুজোর অলৌকিক ইতিহাস জানুন।
বীরভূম, সৌভিক রায়: একদিকে ঘন অরণ্যের গভীর চাদর, অন্যদিকে দুর্ধর্ষ ডাকাতদের নিত্য আনাগোনা এমন এক গা ছমছমে পরিবেশেই ৩০০ বছরেরও বেশি সময় আগে শুরু হয়েছিল মা কালীর আরাধনা। সময়ের পরিবর্তনে জঙ্গল আজ উধাও, মুছে গেছে ডাকাতদের রাজত্বও। কিন্তু কালের নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বীরভূমের ময়ূরেশ্বর-২ ব্লকের বাসুদেবপুর গ্রামে আজও সমান মহিমায় টিকে রয়েছে সেই ঐতিহাসিক দক্ষিণাকালী পুজো। অলৌকিক ইতিহাস আর লোমহর্ষক উপাখ্যানে মোড়া এই পুজোর টানে আজও ভিড় জমান অগণিত ভক্ত।
রক্তবলির অলৌকিক কাহিনি ও ‘ডাকাত কালী’ নামকরণের নেপথ্য লোককথা অনুযায়ী, আজকের এই জনবহুল বাসুদেবপুর গ্রাম একসময় ছিল এক গভীর ও নির্জন জঙ্গল, যা ছিল দুর্ধর্ষ ডাকাত দলের প্রধান আস্তানা। সেই অরণ্যেই মায়ের কৃপা পেতে ঘট স্থাপন করে কালীর সাধনা করতেন ডাকাতরা। পুজোর ইতিহাস নিয়ে প্রচলিত রয়েছে এক শিহরণ জাগানো লোককথা। কথিত আছে, একসময় আকস্মিকভাবেই অচেতন হয়ে পড়েন দলের ডাকাত সর্দার। অনেক চেষ্টা করেও সর্দারের জ্ঞান ফেরাতে না পেরে ঘাবড়ে যান সঙ্গীরা।
উপায় না দেখে শেষমেশ মায়ের কাছে পশুবলি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। বলির পর দেবপ্রতিমার মুখ স্পর্শ করা সেই পবিত্র রক্ত সর্দারের মুখে ছোঁয়াতেই অলৌকিকভাবে ফিরে আসে তাঁর জ্ঞান। এরপরেই মায়ের কৃপায় জীবন ফিরে পাওয়ার আনন্দে পুজোর মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেন ডাকাতরা। লোকমুখেই এই দেবীর নাম হয়ে যায় ‘ডাকাত কালী’। জমিদার আমলের হাতবদল ও পুজোর দায়িত্বভার। কালের নিয়মে ডাকাত দলের উপদ্রব কমলেও হারিয়ে যায়নি মায়ের পুজো। পরবর্তীতে বর্ধমানের জমিদার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে এই পুজোর দায়িত্ব আসে।
জনশ্রুতি রয়েছে, জমিদার আশুতোষ বাবু এক রাতে স্বপ্নাদেশ পেয়ে নতুন উদ্যমে এই পুজো শুরু করেন। তাঁরই বিশেষ নির্দেশে বাসুদেবপুরের গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারের পূর্বপুরুষদের ওপর অর্পিত হয় নিত্যপুজোর পবিত্র দায়িত্ব। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই ধারা নিষ্ঠার সঙ্গে বজায় রেখে চলেছেন গঙ্গোপাধ্যায় পরিবার। পরিবারের বর্তমান সদস্য গৌরীশঙ্কর গঙ্গোপাধ্যায় জানান, তাঁর দাদু দুর্গাদাস গঙ্গোপাধ্যায় এবং বাবা তারাপদ গঙ্গোপাধ্যায় দীর্ঘকাল ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। বাসুদেবপুরের এই দক্ষিণাকালী পুজোর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলও এর প্রতিমা নির্মাণের অনন্য নিয়ম। কোজাগরি লক্ষ্মীপুজোর বিসর্জনের পরপরই, সেই একই কাঠ ও বাঁশের কাঠামো ভেঙে ফেলা হয় না; বরং সেই একই কাঠামোর ওপর রূপ দেওয়া হয় দক্ষিণাকালীর মৃন্ময়ী প্রতিমার। এরপর প্রতি বছর কার্তিকের অমাবস্যা তিথিতে পরম নিষ্ঠা ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মা কালীর আরাধনা সম্পন্ন হয়। আজ জঙ্গল নেই, নেই ডাকাতদের সেই ভয়াল পরিবেশও। কিন্তু গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারের হাত ধরে তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা এই পুজো বীরভূমের গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য ও জীবন্ত ইতিহাস হয়ে আজও আলো ছড়িয়ে চলেছে।
