Last Updated:
Inspirational Story: ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় জীবনযুদ্ধ! সংসারের হাল ধরতে কীভাবে প্রতিদিন টোটোর হ্যান্ডেল ধরে সবজি বিক্রি করেন সুন্দরবনের লক্ষ্মী গায়েন? জানুন।
বসিরহাট, উত্তর ২৪ পরগণা, জুলফিকার মোল্যা: সুন্দরবনের টোটোওয়ালা লক্ষ্মী, যিনি বদলে দিচ্ছেন গ্রামের খাদ্যাভ্যাস। সুস্থ জীবনযাপনের জন্য বিষমুক্ত খাবারের প্রয়োজনীয়তার বার্তা নিয়ে প্রতিদিন গ্রামের পথে পথে ছুটে চলেছে একটি টোটো। গাড়ির গায়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা, ‘সুস্থ জীবন পেতে বিষমুক্ত খাবার খেতে হবে।’ আর সেই টোটোতেই সাজানো থাকে টাটকা, সতেজ সবুজ শাকসবজি। তবে এই টোটোর বিশেষত্ব শুধু তার পসরা নয়, এর চালকের পরিচয়ও। কারণ, টোটোর চালকের আসনে রয়েছেন একজন মহিলা। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে নিজের লড়াইয়ের পাশাপাশি গ্রামের মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলানোর চেষ্টা করছেন সুন্দরবনের লক্ষ্মী গায়েন।
উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জের ১৪ নম্বর স্যান্ডেলার বিলের বাসিন্দা লক্ষ্মী গায়েন। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী হলেও পরিস্থিতির কাছে হার মানেননি তিনি। প্রায় ২০-২৫ বছর ধরে প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে সংসার সামলাচ্ছেন লক্ষ্মী। যেখানে সাধারণত পরিবারের উপার্জনের দায়িত্ব পুরুষের কাঁধে থাকে, সেখানে সেই প্রচলিত ধারণা ভেঙে নিজেই জীবিকার পথ বেছে নিয়েছেন তিনি। স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে সংসারের হাল ধরতে হাতে তুলে নিয়েছেন টোটোর হ্যান্ডেল। লক্ষ্মীর প্রতিদিনের জীবন শুরু হয় ভোরের আলো ফোটার আগেই। প্রথমে বাড়ির যাবতীয় কাজ সেরে সবজি সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর যত্ন করে টোটোতে সাজিয়ে নেন বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। সব প্রস্তুতি শেষ হলেই শুরু হয় তাঁর প্রতিদিনের পথচলা। নিজেই টোটো চালিয়ে বেরিয়ে পড়েন গ্রামের উদ্দেশে। আমবেড়িয়া, ১৩ নম্বর, স্বরূপকাঠি, লেবুখালী, কাঠারবাড়ি, বাঁকড়া-সহ সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় গ্রামে গ্রামে ঘুরে সবজি বিক্রি করেন তিনি।
লক্ষ্মীর এই ভ্রাম্যমাণ সবজির দোকানের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন এলাকার বহু মানুষ। হাতে ব্যাগ নিয়ে গ্রামের রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকেন কেউ কেউ। কখন লক্ষ্মী আসবেন, কখন তাঁর টোটো থেকে প্রয়োজনীয় সবজি কিনবেন, সেই অপেক্ষায় থাকেন তাঁরা। কারণ, বাড়ির কাছেই পাওয়া যায় প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় নানা ধরনের সবজি। আলু, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা থেকে শুরু করে শিম, বিট, টমেটো, ওল, বিভিন্ন ধরনের শাক এবং মরশুমি সবজি—সবই থাকে তাঁর টোটোয়। তবে লক্ষ্মীর এই উদ্যোগ শুধুমাত্র সবজি বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। টোটোর গায়ে লেখা ‘সুস্থ জীবন পেতে বিষমুক্ত খাবার খেতে হবে’ বার্তার মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের কাছে নিরাপদ ও সতেজ খাবারের গুরুত্ব তুলে ধরতে চান। প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে গ্রামের মানুষের দোরগোড়ায় সবজি পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিরও চেষ্টা করছেন তিনি।
দিনভর গ্রামে গ্রামে ঘুরে সবজি বিক্রি করে ফেরেন বাড়িতে। তারপর আবার সংসারের কাজকর্ম। এভাবেই প্রতিদিন চলতে থাকে তাঁর জীবনসংগ্রাম। অভাবের কাছে মাথা নত না করে নিজের পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সম্বল করেই এগিয়ে চলেছেন লক্ষ্মী গায়েন। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামের এই মহিলা যেন প্রমাণ করছেন, জীবনের কঠিন পরিস্থিতিও একজন মানুষের এগিয়ে চলার পথ আটকে রাখতে পারে না। তাঁর টোটোর চাকা শুধু জীবিকার সন্ধানে ঘোরে না, সেই চাকার সঙ্গেই ঘুরছে স্বনির্ভরতার এক অন্যরকম গল্প।
