Last Updated:
Inspirational Story: ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েও দমে যাননি পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতনের তপন রানা। একাধিক বাদ্যযন্ত্রের সুরসাধনা ও নিপুণ চিত্রকলার যুগলবন্দিতে আজ তিনি গোটা এলাকার অনুপ্রেরণা।
দাঁতন, পশ্চিম মেদিনীপুর, রঞ্জন চন্দ: ছোটবেলাতেই মাথার উপর থেকে মুছে গিয়েছিল বাবার স্নেহের ছায়া। কিন্তু নিয়তির সেই নিষ্ঠুর আঘাতকে নিজের দুর্বলতা হতে দেননি পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতনের গোলা বাজারের যুবক তপন রানা। বরং বাবার স্মৃতি ও শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে জীবনের মূল দিশা খুঁজে নিয়েছেন তিনি। অল্প বয়সে পিতৃহারা হওয়া এই যুবকের পাশে শক্ত খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সরকারি কর্মী মা। সেই পারিবারিক আবহে বড় হয়ে আজ তপন হয়ে উঠেছেন গোটা তল্লাটের গর্ব। তাঁর সৃষ্টিশীলতার স্পর্শে মেদিনীপুরের এই প্রত্যন্ত জনপদ এখন সুর আর রঙের এক আশ্চর্য মেলবন্ধনের সাক্ষী।
সুরসাধনায় নিজেকে নিমজ্জিত রেখে আজ দেশি-বিদেশি একাধিক বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী হয়ে উঠেছেন তপন। তাঁর আঙুলের জাদুকরি ছোঁয়ায় কখনও সুর তোলে বাঁশি, কখনও কেঁপে ওঠে অক্টোপ্যাডের তাল, আবার কখনও গমগম করে বাজে তানপুরা কিংবা মেলোডিকা। সঙ্গীত প্রতিভাকে শানিয়ে নিতে তিনি ছুটে গিয়েছেন বাংলা থেকে শুরু করে ওড়িশার প্রখ্যাত সঙ্গীতগুরুদের কাছে। বহু ধারার বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব এক সঙ্গীতশৈলী, যা সচরাচর দেখা মেলে না। কেবল বাদ্যযন্ত্র বাদনেই থেমে থাকেননি, নিজেই গীতিকার হিসেবে গান বাঁধছেন এবং সেই কথায় জোগাচ্ছেন অনবদ্য সুরও।
বর্তমানে বেলদার একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে অঙ্কন ও সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন তপন। তবে শিক্ষকতার বাঁধা ছকের বাইরে তাঁর গোটা অবসর কাটে সাধনায়। দাঁতনের চৌহদ্দি পেরিয়ে নিয়মিত বিভিন্ন মঞ্চানুষ্ঠানে তিনি মুগ্ধ করছেন শ্রোতাদের। তাঁর বিচিত্র বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনা শুনতে ভিড় জমান সঙ্গীতপ্রেমী মানুষ, আর প্রেক্ষাগৃহের করতালিই যেন তাঁর নিত্যদিনের ক্লান্তি মুছে দেয়। স্থানীয়দের চোখে তিনি আজ শুধু একজন শিক্ষক বা শিল্পী নন, লড়াই করে মাথা তুলে দাঁড়ানোর এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
সুরসৃষ্টির পাশাপাশি ক্যানভাসে তুলির টানেও সমান সাবলীল এই তরুণ। পরিবারে গানের চল না থাকলেও বাবার ছবি আঁকার গভীর দক্ষতা ছিল, যা রক্তে ও প্রতিভায় উত্তরাধিকার সূত্রে বহন করছেন তপন। তাঁর নিপুণ তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে ওঠে নানা রূপ ও ভাব। বিভিন্ন প্রদর্শনীতে সমাদৃত হওয়ার পাশাপাশি বিক্রিও হচ্ছে তাঁর সৃষ্টি। একদিকে বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনা, অন্যদিকে তুলির রঙ—এই দুই বিপরীতমুখী মাধ্যমের যুগলবন্দিতেই জীবনের আসল সুর খুঁজে চলেছেন দাঁতনের তপন রানা।
