কোনও গাড়ি নয়, কোনও বাহন নয়, ভক্তদের কাঁধে চেপেই ছুটে চলেন দেবী। এমনই এক বিস্ময়কর বিসর্জন রীতির সাক্ষী থাকে পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ার মুস্থূলী গ্রামের প্রাচীন বোলতলা কালীপুজো। যেখানে বিসর্জন মানে শুধুই প্রতিমা নিরঞ্জন নয়, বরং কয়েকশো বছরের বিশ্বাস, ভক্তি আর লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রকাশ।
প্রায় তিনশো বছরের প্রাচীন এই পুজোয় দেবী পূজিতা হন ‘মা বোলতলা কালী’ নামে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, মা অত্যন্ত জাগ্রত। ভক্তদের কখনও নিরাশ করেন না তিনি। গড়ে উঠেছে পুজো ট্রাস্টও। ট্রাস্ট ও গ্রামবাসীদের সম্মিলিত উদ্যোগে আজও নিষ্ঠার সঙ্গে বজায় রয়েছে প্রাচীন রীতিনীতি। তবে এই পুজোর বিশেষত্ব শুধু দেবীর আরাধনায় নয়, বরং বিসর্জনের সেই শিহরণ জাগানো মুহূর্তে।
পুজো কমিটির সম্পাদক উজ্বল কুমার মুখার্জী বলেন, “এটাই আমাদের গ্রামের প্রধান উৎসব। মায়ের বিসর্জন দেখার জন্য দূর দূরান্ত থেকে বহু মানুষ আসেন। এটা আমাদের প্রায় ৩০০ বছরের বেশি পুরোনো ঐতিহ্য।” দীপান্বিতা অমাবস্যার দুপুরে মন্দির চত্বরে শুরু হয় সিঁদুরখেলার বিশেষ পর্ব। এলাকার বিবাহিতা মহিলারা একে অপরকে সিঁদুরে রাঙিয়ে শুভ কামনা জানান।
রাত গভীর হলে, প্রায় ১২টার পর তন্ত্রমতে শুরু হয় দেবীর পুজো। প্রায় ১১ ফুট উচ্চতার প্রতিমা সেজে ওঠেন সোনা ও রুপোর অলঙ্কারে। নতুন রঙের প্রলেপে দেবী ধারণ করেন এক নব রূপ। কিন্তু রাতের এই আরাধনার পরেই অপেক্ষা করে এমন এক দৃশ্য, যা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন অসংখ্য মানুষ। মন্দির থেকে দেবীকে বের করার মুহূর্তে নিভিয়ে দেওয়া হয় গ্রামের সমস্ত আলো। চারপাশে নেমে আসে ঘন অন্ধকার। সেই অন্ধকারে একমাত্র আলোর উৎস গ্রামবাসীদের হাতে জ্বলতে থাকা পাটকাঠির মশাল।
মশালের আলোয় আলোকিত হয় পথ, আর সেই পথেই কাঁধে দেবীকে তুলে নেন ভক্তরা। শুরু হয় দৌড়। মুহূর্তের মধ্যে ‘জয় মা কালী’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। মশালের আগুন, মানুষের উচ্ছ্বাস আর দেবীকে নিয়ে ছুটে চলার দৃশ্য মিলেমিশে তৈরি করে এক অপার্থিব আবহ।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, মা বোলতলা কালীকে হেঁটে নিয়ে যাওয়া যায় না। তাঁকে কাঁধে তুলে দৌড়ে নিয়ে যাওয়াই প্রাচীন নিয়ম। সেই নিয়ম মেনেই মুস্থূলী থেকে দেবীকে নিয়ে ছুটে যাওয়া হয় পাশের গ্রাম আমডাঙায়। সেখানে অবস্থান করছেন বুড়ো শিব। দেবী ও শিবের ‘দর্শন’ পর্ব সম্পন্ন হয় সেখানেই।
এর পর ফের একইভাবে দৌড়ে দেবীকে ফিরিয়ে আনা হয় মুস্থূলী গ্রামে। মন্দির সংলগ্ন পুকুরে সম্পন্ন হয় প্রতিমা বিসর্জনের আচার।সময়ের সঙ্গে বদলেছে অনেক কিছু। বদলেছে গ্রামের চেহারা, বদলেছে উৎসবের আয়োজন। কিন্তু মুস্থূলীর বোলতলা কালীর বিসর্জনের এই প্রাচীন রীতি আজও অমলিন। অন্ধকারে মশালের আলোয় দেবীকে নিয়ে সেই দৌড় যেন মনে করিয়ে দেয়, বাংলার গ্রামবাংলায় আজও বেঁচে রয়েছে এমন কিছু ঐতিহ্য, যা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, এক একটি গ্রামের আত্মপরিচয়।
