Last Updated:
পরিবারের বহু সদস্য বর্তমানে গুসকরায় থাকেন না। তবে দুর্গাপুজোর সময় পরিবারের সকলে একত্রিত হন পুরনো বাড়িতে। পুজোকে ঘিরে ফিরে আসে পারিবারিক মিলনমেলার আবহ।
পুজোর দিনগুলিতে আলো আর আলপনায় ঝলমল করে ওঠে পূর্ব বর্ধমানের গুসকরার চোঙদারবাড়ি। বাড়ির শরীরে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। কোথাও খসে পড়েছে পলেস্তারা, কোথাও পুরনো দেওয়ালে জমেছে সময়ের চিহ্ন। কিন্তু ঐতিহ্য, ধুমধাম আর জাঁকজমকে এতটুকু ভাটা পড়েনি। কয়েক শতাব্দী প্রাচীন এই জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজোই গুসকরার প্রাচীনতম পুজো বলে পরিচিত। শাক্ত মতে পুজো হয় এখানে। সপ্তমী থেকে প্রতিদিন চলে হোম-যজ্ঞ। আর সন্ধিপুজোর সময় আজও বন্দুক চালানোর রীতি বজায় রয়েছে।
পরিবারের ইতিহাস অনুযায়ী, ইংরেজ আমলে চট্টগ্রাম থেকে গুসকরায় এসেছিলেন চোঙদার পরিবারের পূর্বপুরুষেরা। ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, মূলত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাজে সহায়তার জন্যই তাঁদের ডাকা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে ওই অঞ্চলে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন তাঁরা। তৈরি হয় বিশাল বাড়ি এবং দুর্গাদালান। দুর্গাপুজোর পাশাপাশি শুরু হয় কালীপুজো ও জগদ্ধাত্রী পুজোও।
সময়ের সঙ্গে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। বদলেছে পরিস্থিতি। কিন্তু জমিদারদের হাত ধরে শুরু হওয়া দুর্গাপুজোর পরম্পরা আজও ধরে রেখেছেন পরিবারের বর্তমান সদস্যরা। বিশাল বাড়ির কেন্দ্রে রয়েছে বড় দুর্গামন্দির। পুরনো বাড়ির টানা বারান্দার পলেস্তারা খসে পড়লেও পুজোর ক’দিনে আলো, আলপনা আর আয়োজনের মধ্য দিয়ে ফিরে আসে পুরনো দিনের আবহ।
চোঙদারবাড়ির পুজোয় আজও রীতি মেনে একাধিক আচার পালন করা হয়। সপ্তমী থেকে প্রতিদিন চলে হোম-যজ্ঞ। নবমীতে আয়োজন করা হয় কুমারীপুজোর। মহাষ্টমীর অঞ্জলি দিতে ভিড় করেন বহু মানুষ। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি এলাকার বাসিন্দারাও পুজোর আনন্দে শামিল হন। এমনকী এলাকার বাইরে থেকেও অনেকে এই প্রাচীন পুজো দেখতে হাজির হন। পরিবারের বহু সদস্য বর্তমানে গুসকরায় থাকেন না। তবে দুর্গাপুজোর সময় পরিবারের সকলে একত্রিত হন পুরনো বাড়িতে। পুজোকে ঘিরে ফিরে আসে পারিবারিক মিলনমেলার আবহ।
চোঙদারবাড়ির দুর্গাপুজোর অন্যতম বিশেষ রীতি ঘটকে ঘিরে। সাধারণত দশমীর দিনে ঘট বিসর্জন করা হয়। কিন্তু এই বাড়িতে দশমীর দিন ঘট বিসর্জন করা হয় না। বরং ওই দিন ঘট প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং তা রেখে দেওয়া হয় গোটা এক বছর। পরের বছর ষষ্ঠীর দিন সেই ঘট বিসর্জন করা হয়। পরিবারের মঙ্গল কামনায় এই রীতি পালন করা হয় বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
এ ছাড়াও সপ্তমী থেকে দশমী—পুজোর চার দিনই জ্বালিয়ে রাখা হয় প্রদীপ। সময় বদলেছে, জমিদারি নেই, পুরনো বাড়িও হারিয়েছে জৌলুসের কিছুটা অংশ। তবু বন্দুকের শব্দে সন্ধিপুজো, হোম-যজ্ঞ, কুমারীপুজো আর ঘটকে ঘিরে বিশেষ রীতির মধ্য দিয়ে গুসকরার চোঙদারবাড়িতে আজও বেঁচে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্য।

