Last Updated:
পুজোর দিনগুলিতে আত্মীয়স্বজনদের উপস্থিতিতে জমজমাট হয়ে ওঠে কাঞ্চননগরের মণ্ডল বাড়ি। থাকে পঙ্ক্তিভোজন, আনন্দ-উল্লাস আর পরিবারের সকলের একসঙ্গে সময় কাটানোর মুহূর্ত।
বর্ধমান: তাঁত বুনে কোনও রকমে সংসার চলত। অভাবের সংসারে দুর্গাপুজোর আয়োজন করা ছিল কার্যত অসম্ভব। কিন্তু মা দুর্গা যদি স্বপ্নে এসে ধরা দেন, তা হলে কি আর তাঁকে উপেক্ষা করা যায়? তাই সংসারের অভাবকে উপেক্ষা করেই শুরু হয়েছিল দেবী দুর্গার আরাধনা। পুজোর খরচ জোগাড় করতে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষে করতে হয়েছিল। সেই ভিক্ষের চাল আর কড়ি দিয়েই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল মা দুর্গার। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গিয়েছে প্রায় ১৩০ বছর। আজও বর্ধমানের কাঞ্চননগরের মণ্ডল বাড়িতে সেই প্রথা মেনেই হয় দুর্গাপুজো।
প্রায় ১৩০ বছর আগের কথা। বর্ধমানের কাঞ্চননগরের তন্তুবায় পাড়ায় বাস করতেন পাঁচকড়ি মণ্ডল। পেশায় তাঁতি পাঁচকড়ির সংসার চলত বাড়িতে তাঁত বুনে কাপড় তৈরি ও বিক্রি করে। অভাবের সংসার হলেও বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত ছিল মা কালীর পুজো। কিন্তু বংশরক্ষার জন্য সন্তানের আকাঙ্ক্ষায় কাতর ছিলেন পাঁচকড়ির স্ত্রী। সন্তানের আশায় তিনি বারবার প্রার্থনা জানাতেন মা কালীর কাছে। লোককথা অনুযায়ী, একদিন স্বপ্নাদেশ পান পাঁচকড়ির স্ত্রী। মা কালী তাঁকে জানান, সন্তান-সন্ততি নিয়ে তিনি আসবেন। সেই স্বপ্নাদেশের পরই শুরু হয় নতুন ভাবনা। তবে কি মা দুর্গারূপে আবির্ভূত হতে চান? স্ত্রীর কথায় কালীর পুজোর পাশাপাশি দুর্গাপুজোর আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেন পাঁচকড়ি মণ্ডল।
কিন্তু ইচ্ছা থাকলেই তো হয় না! দুর্গাপুজোর আয়োজন করতে প্রয়োজন অর্থের। সামান্য তাঁতের কাজ করে যে সংসার চলত, সেখানে এত বড় পুজোর খরচ জোগাড় হবে কী করে? শেষ পর্যন্ত পুজোর জন্য বাড়ি বাড়ি ভিক্ষে করতে শুরু করেন পাঁচকড়ি মণ্ডল।
ভিক্ষে করে পাওয়া চাল জমা হতে থাকে ঠাকুরঘরে। সেই ভিক্ষের কড়ি একত্রিত করেই কালীর মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয় মা দুর্গাকে। এভাবেই শুরু হয় মণ্ডল বাড়ির দুর্গাপুজো। পরিবারের বিশ্বাস, এরপর ধীরে ধীরে তাঁদের জীবনে স্বচ্ছলতা আসে। বংশরক্ষার চিন্তাও আর থাকেনি আগের মতো।
সময়ের সঙ্গে মণ্ডল পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। একসময়ের অভাবের সংসারে এখন তুলনামূলক স্বচ্ছলতা এসেছে। কিন্তু হারিয়ে যায়নি পূর্বপুরুষদের সেই ঐতিহ্য। আজও নিয়মরক্ষার জন্য মণ্ডল বাড়িতে ভিক্ষের প্রথা পালন করা হয়। শুধু পারিবারিক রীতি হিসেবেই নয়, অনেকেই মনোবাঞ্ছা পূরণের আশায় ভিক্ষের মানত করেন। সেই মানত পূরণ করতে নিয়ম মেনে ভিক্ষে করেন তাঁরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই প্রথা আজও পুজোর অন্যতম আকর্ষণ।
মণ্ডল বাড়ির দুর্গাপুজোয় রয়েছে নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠানও। মহাষষ্ঠীতে পালকিতে করে কলাবউ আনা হয়। কলাবউ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই শুরু হয় পুজোর পর্ব। বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা সর্বমঙ্গলার মন্দিরের নির্ঘণ্ট মেনে চলে পুজোর সময়সূচি। অভাবের সংসারে স্বপ্নাদেশ থেকে শুরু হওয়া যে পুজোর ইতিহাস, আজ তা প্রায় ১৩০ বছরের ঐতিহ্য। সময় বদলেছে, বদলেছে পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতিও। কিন্তু ভিক্ষে করে পুজো শুরুর সেই স্মৃতি আর পূর্বপুরুষদের রীতি আজও আগলে রেখেছে বর্ধমানের কাঞ্চননগরের মণ্ডল পরিবার।

