Headlines

Durga Puja 2026: শের শাহের দান করা জমিতে ৩৭২ বছরের দুর্গাপুজো, জামালপুরের ঘোষাল বাড়ির ইতিহাস | পূর্ব বর্ধমান


Last Updated:

পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের কোলসরা গ্রামে ঘোষাল বাড়ির ৩৭২ বছরের দুর্গাপুজো। শের শাহের জমি দান, স্বপ্নাদেশ ও গঙ্গাজলে ভোগ রান্নার প্রাচীন রীতি জানুন।

News18
News18

পূর্ব বর্ধমান: তখন চলছিল জি টি রোড সংস্কারের কাজ। সেই কাজ তদারকি করতে এসেছিলেন শের শাহ। আর সেই সময়ই দুর্গাপুজোর জন্য জমি দান করেছিলেন সম্রাট! সেই জমির আয় থেকেই আজও দুর্গাপুজো হয়ে আসছে পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের কোলসরা গ্রামের ঘোষাল পরিবারে। এবার এই পুজো পা দিল ৩৭২ বছরে। ইতিহাস, স্বপ্নাদেশ আর প্রাচীন পারিবারিক রীতির মেলবন্ধনে আজও অমলিন এই বনেদি বাড়ির পুজো।

ঘোষাল পরিবারের সদস্যদের কথায়, তাঁদের পূর্বপুরুষ দিগম্বর ঘোষাল ছিলেন শের শাহের বিশ্বস্ত কর্মচারী। ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে জি টি রোড সংস্কারের সময় কাজের তদারকির জন্য দিগম্বরকে এই অঞ্চলে পাঠিয়েছিলেন শের শাহ। সেই সূত্রেই কোলসরা গ্রামে ঘোষাল পরিবারের বসবাস শুরু হয়। পরিবারের বিশ্বাস, দুর্গাপুজোর জন্য শের শাহের দান করা জমির আয় থেকেই পরবর্তীকালে পুজোর খরচের ব্যবস্থা হয়। সেই ঐতিহ্য আজও বহন করে চলেছেন পরিবারের বর্তমান সদস্যরা।

পরিবারের সদস্য সমীর ঘোষাল জানান, দিগম্বরের বংশধর ঈশ্বরচন্দ্র ঘোষাল স্বপ্নাদেশ পেয়ে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। পরিবারের বিশ্বাস, একদিন কলাবাগানে এক বালিকার দর্শন পেয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র। তাঁদের বিশ্বাস, সেই বালিকাই ছিলেন দেবী দুর্গা। আর সেই বিশ্বাস থেকেই পুজোর ভোগে কলা, থোড় ও মোচার বিভিন্ন পদ নিবেদনের রীতি শুরু হয়। কয়েক শতক পেরিয়েও সেই প্রথা আজও অক্ষুণ্ণ।

এই পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব, মহালয়ার দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় দেবীর আরাধনা। চলে দশমী পর্যন্ত। পুজোর প্রতিদিনই দেবীকে ভোগ নিবেদন করা হয়। আর সেই ভোগ রান্নার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ রীতি। রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয় গঙ্গাজল। পুজোর আগে বড় বড় পাত্রে করে গঙ্গা থেকে জল নিয়ে আসা হয়। সেই জল দিয়েই প্রতিদিনের ভোগ রান্না করা হয়। প্রাচীন এই রীতিতে সামান্যতম পরিবর্তন আনতে চান না পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের কাছে এটি শুধুমাত্র একটি প্রথা নয়, বরং পূর্বপুরুষদের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার অঙ্গীকার।

ঘোষাল বাড়ির প্রতিমাতেও রয়েছে সাবেকিয়ানার ছাপ। দেবীর চোখ বাঁশপাতার মতো। আধুনিকতার ছোঁয়া এড়িয়ে নিজস্ব রীতিতেই তৈরি হয় প্রতিমা। জন্মাষ্টমীর দিন দেবীর কাঠামোয় মাটি দেওয়া হয়। তারপর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে প্রতিমা। পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয় অনেক আগে থেকেই। কাঠামোয় মাটি পড়ার দিন থেকেই যেন পরিবারের সদস্যদের মনে বেজে ওঠে আগমনী সুর।

৩৭২ বছরের এই পুজো কেবল ঘোষাল পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাসীদের অংশগ্রহণে তা হয়ে উঠেছে সকলের উৎসব। পুজোর দিনগুলিতে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি গ্রামের মানুষও সামিল হন আনন্দে। পুরনো রীতিনীতি মেনে দেবীর আরাধনা, ভোগ নিবেদন এবং পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে কোলসরা গ্রামের এই পুজো আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল।

সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়েছে চারপাশের পৃথিবী। বদলেছে জীবনযাত্রা, হারিয়ে গিয়েছে বহু পুরনো রীতি। কিন্তু কোলসরা গ্রামের ঘোষাল পরিবারে আজও ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দুর্গাপুজো। শের শাহের সঙ্গে পরিবারের পূর্বপুরুষের যোগ, জমি দানের স্মৃতি, ঈশ্বরচন্দ্রের স্বপ্নাদেশ এবং গঙ্গাজলে ভোগ রান্নার প্রথা—সব মিলিয়ে এই পুজো যেন অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সেতুবন্ধন।

৩৭২ বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ঐতিহ্যকে আগলে রেখেছেন ঘোষাল পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের কাছে দুর্গাপুজো শুধু কয়েক দিনের উৎসব নয়, বরং পূর্বপুরুষদের বিশ্বাস, পারিবারিক পরিচয় এবং শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকার এক আবেগঘন অধ্যায়। আর সেই আবেগেই প্রতি বছর মহালয়ার দিন থেকে কোলসরার ঘোষাল বাড়িতে শুরু হয় দেবী দুর্গার আরাধনা।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *