Last Updated:
District Durga Puja 2026: পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের ঘন জঙ্গলের মাঝে কালিকাপুর জমিদারবাড়িতে প্রায় ৪০০ বছর ধরে চলছে দুর্গাপুজো। জানুন রায় পরিবারের বনেদি পুজোর ইতিহাস ও ঐতিহ্য।
পূর্ব বর্ধমান: ঘন জঙ্গলের বুক চিরে চলে গিয়েছে কালো পিচের রাস্তা। রাস্তার দু’পাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে বড় বড় গাছ। চারপাশে পশুপাখির ডাক, নির্জন পরিবেশ। এই জঙ্গলের গভীরে যে লুকিয়ে রয়েছে এক প্রাচীন জমিদারবাড়ি, তা আগে থেকে জানা না থাকলে সহজে বোঝার উপায় নেই। পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের কালিকাপুরের এই জমিদারবাড়িতেই প্রায় ৪০০ বছর ধরে হয়ে আসছে দেবী দুর্গার আরাধনা। সময় বদলেছে, হারিয়ে গিয়েছে জমিদারি জৌলুস। কিন্তু আজও অমলিন বনেদি বাড়ির পুজোর ঐতিহ্য। কীভাবে শুরু হয়েছিল এই পুজো?
আউশগ্রামের জঙ্গলাকীর্ণ পথ ধরে কয়েক কিলোমিটার এগোলেই পৌঁছে যাওয়া যায় কালিকাপুর জমিদারবাড়িতে। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয় এখানকার মনোরম পরিবেশ। আর গন্তব্যে পৌঁছতেই চোখ আটকে যায় সাত মহলা জমিদারবাড়ির স্থাপত্যে। লম্বা থাম, প্রাচীন খিলান আর বিশাল দুর্গাদালান—সব মিলিয়ে বাড়িটির আনাচকানাচে ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের ছাপ। সময়ের সঙ্গে বাড়ির দেওয়াল থেকে খসে পড়েছে ইট, কাঠামোয় এসেছে জীর্ণতার চিহ্ন। তবু সেই প্রাচীন দুর্গাদালানেই আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পূজিত হন দেবী দুর্গা।
কালিকাপুরের রায় পরিবারের এই পুজোর বয়স আনুমানিক ৪০০ বছর। ঠিক কবে, পরিবারের কে প্রথম দুর্গাপুজোর সূচনা করেছিলেন, তা আজ আর স্পষ্টভাবে জানা যায় না। তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন পরিবারের সদস্যরা। কথিত রয়েছে, এক সময় রেললাইন নির্মাণের কাজে কাঠের গুঁড়ি সরবরাহ করে আর্থিকভাবে যথেষ্ট লাভবান হয়েছিল রায় পরিবার। সেই অর্থে প্রচুর জমি কেনা হয়। পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠে সাত মহলা আলাদা আলাদা বাড়ি। জমিদারি প্রতিষ্ঠার পরই শুরু হয় দেবী দুর্গার আরাধনা।
আজ আর সেই জমিদারি নেই। নেই অতীতের সেই প্রতিপত্তিও। কিন্তু দুর্গাপুজোকে ঘিরে পরিবারের সদস্যদের আবেগে এতটুকু ভাটা পড়েনি। পুজোর সময় পরিবারের সকলে একত্রিত হন। পুরনো রীতি মেনেই চলে দেবীর আরাধনা। কালিকাপুর জমিদারবাড়িতে কৃষ্ণা নবমীর দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় পুজোর আয়োজন। বনেদি বাড়ির নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠান মেনেই এগিয়ে চলে পুজোর প্রতিটি পর্ব।
জমিদারবাড়ির সাত মহল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীনত্ব আজও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। জীর্ণ দেওয়াল, দীর্ঘ বারান্দা, লম্বা থাম আর খিলানের ফাঁকে যেন লুকিয়ে রয়েছে কয়েক শতকের ইতিহাস। এক সময়ের জমিদারি বৈভবের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই বাড়ি। তারই মাঝে দুর্গাদালানে প্রতি বছর ফিরে আসে উৎসবের আবহ। ইতিহাস আর ধর্মীয় ঐতিহ্য এখানে মিলেমিশে একাকার।
আর সেই টানেই পুজোর সময় দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ ছুটে আসেন কালিকাপুরে। জঙ্গলের নির্জন পথ পেরিয়ে তাঁরা পৌঁছে যান প্রাচীন জমিদারবাড়ির ঠাকুরদালানে। কারও কাছে এই পুজো বনেদিয়ানার স্বাদ, কারও কাছে ইতিহাসের সন্ধান, আবার কারও কাছে কয়েকশো বছরের পারিবারিক ঐতিহ্যের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ।
সময়ের স্রোতে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। ভেঙে পড়ে প্রাচীন স্থাপত্য, বদলে যায় জীবনযাত্রা, মুছে যায় একসময়ের প্রতিপত্তির চিহ্ন। কিন্তু কিছু ঐতিহ্য থেকে যায় মানুষের বিশ্বাস আর আবেগের মধ্যে। আউশগ্রামের কালিকাপুর জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজোও তেমনই এক ইতিহাস—যেখানে জঙ্গলের নিস্তব্ধতার মাঝেও প্রতি বছর বেজে ওঠে উৎসবের সুর, আর প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো পরম্পরায় আজও ফিরে আসেন দেবী দুর্গা।

